একটি বিদ্যালয়ের আসল সম্পদ কেবল বহুতল ভবন, আধুনিক আসবাবপত্র কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ নয়। বিদ্যালয়ের প্রকৃত সম্পদ হলেন যোগ্য, সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং তাঁদের সঠিক পথে পরিচালনার জন্য একজন দক্ষ ও দূরদর্শী প্রধান শিক্ষক। অর্থ ব্যয় করে সুন্দর ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হলেও আদর্শবান শিক্ষক তৈরি করা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধ, সামাজিক মর্যাদা ও শিক্ষকতার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। এই সত্যটি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তুলে ধরেছেন শায়েস্তাগঞ্জ হাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমানে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে কর্মরত একজন লেখক। তিনি তাঁর স্মৃতিচারণে তুলে ধরেছেন বিদ্যালয়ের কিংবদন্তিতুল্য প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক আবদুন নূর চৌধুরী স্যারের অসামান্য অবদান ও শিক্ষাদর্শন।
আবদুন নূর চৌধুরী স্যার শিক্ষার্থীদের গণিত পড়াতেন। তাঁর পড়ানোর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল। শ্রেণিকক্ষে কোনো বিষয় ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার পর তিনি পরের দিনের জন্য নির্দিষ্ট অনুশীলনী দিয়ে দিতেন। শিক্ষকের আন্তরিকতার কারণে শিক্ষার্থীদের আলাদা করে কোনো প্রাইভেট বা কোচিং করার প্রয়োজন হতো না। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষই ছিল তাঁদের শেখার প্রধান জায়গা। আজকের দিনে যখন শিক্ষার্থীরা কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তখন লেখকের মনে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করেছি, নাকি শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছি?
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম সারির প্রায় ১০ জন ছাত্রকে নিয়ে একটি বিশেষ পরিকল্পনা করেছিলেন প্রধান শিক্ষক। প্রথমার্ধে নিয়মিত ক্লাসের পর দিনের শেষ তিনটি পিরিয়ডে তাঁদের জন্য বৃত্তি পরীক্ষার বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের অন্যান্য গুণী শিক্ষকেরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এই অতিরিক্ত ক্লাসগুলো নিতেন। আজকের প্রজন্মের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এই অতিরিক্ত শ্রমের জন্য শিক্ষকেরা কোনো আলাদা পারিশ্রমিক বা কোচিং ফি নিতেন না। ছাত্রদের সাফল্য এবং বিদ্যালয়ের সুনামই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর লেখক যখন বৃত্তি পান, তখন কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁর বাবা শিক্ষকদের মিষ্টিমুখ করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, “এটা ঠিক হবে না।” এই সামান্য কয়েকটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক অনন্য নৈতিক শিক্ষা, যা নিজের জীবন ও আচরণের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছিলেন।
নবম শ্রেণিতে ওঠার পর থেকেই এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তদারকি শুরু করতেন স্যার। তাঁর শিক্ষা-দর্শনে কাউকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না; তাই মেধাবীদের পাশাপাশি দুর্বল ছাত্রদের জন্যও ছিল বিশেষ পরিকল্পনা। এছাড়া বিদ্যালয়ের যেসব প্রাক্তন ছাত্র বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তেন, তাঁদেরও বর্তমান ছাত্রদের সহায়তায় সম্পৃক্ত করতেন তিনি। তাঁরাও কোনো পারিশ্রমিক ছাড়া ছোট ভাইদের পড়াতেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেন। এভাবেই বিদ্যালয়টি প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের এক আত্মিক বন্ধনে পরিণত হয়েছিল।
শিক্ষা যে শুধু পাঠ্যবই বা পরীক্ষার ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা বিশ্বাস করতেন আবদুন নূর চৌধুরী স্যার। প্রতিদিনের অ্যাসেম্বলিতে আলাদা আলাদা ছাত্রকে গান গাইতে হতো, যা তাদের জড়তা কাটিয়ে আত্মবিশ্বাস ও জনসমক্ষে কথা বলার সাহস জোগাত। এছাড়া স্কাউটিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের তদারকি তিনি নিজেই করতেন এবং এগুলোর জন্য অভিভাবকদের ওপর কোনো অতিরিক্ত ফি চাপানো হতো না। টিফিনের সামান্য অর্থ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছভাবে ব্যবহার করা হতো।
বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বিদেশে শিক্ষা-মডেল খোঁজার চেয়ে আমাদের নিজেদের অতীতের সফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা উচিত বলে মনে করেন লেখক। আবদুন নূর চৌধুরীর মতো শিক্ষকেরা যেভাবে সীমিত সম্পদের মধ্যে একটি বিদ্যালয়কে সফলভাবে পরিচালনা করেছেন, তা আমাদের শিক্ষা-সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হতে পারে। শিক্ষককে কেবল একজন চাকরিজীবী হিসেবে না দেখে জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে মর্যাদা এবং প্রধান শিক্ষককে প্রকৃত শিক্ষানেতা হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমেই গ্রামের স্কুলগুলো আবার জেগে উঠবে এবং মানুষ তৈরি করবে।

