ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে ১০৯ রানে ১১ উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে সিরিজ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন ম্যাট হেনরি। তবে নিজের এই চোখধাঁধানো সাফল্যের পেছনে সতীর্থ উইকেটকিপার টম ব্লান্ডেলের অবদানকে বিশেষভাবে স্বীকার করেছেন এই কিউই ফাস্ট বোলার। উইকেটের একদম কাছে দাঁড়িয়ে হেনরির ৯টি আউটে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন ব্লান্ডেল। হেনরি বলেছিলেন, টমের মতো একজন বিশ্বমানের উইকেটকিপার উইকেটের পেছনে থাকা দলের জন্য বিশাল এক পাওয়া। উইকেটের পেছনে অসাধারণ কেউ না থাকলে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো না। তারা কেবল চেয়েছিলেন ইংলিশ ব্যাটারদের যতটা সম্ভব ক্রিজে আটকে রাখতে, কারণ তারা সবসময় ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে আক্রমণাত্মক খেলার চেষ্টা করছিল।
ব্লান্ডেলের উইকেটের কাছে দাঁড়ানোর এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনটিই সিরিজের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ওভাল টেস্টের আগে ইংল্যান্ড ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ড সিরিজে ২-১ ব্যবধানে কামব্যাক সম্পন্ন করে। জো রুট এবং হ্যারি ব্রুকের উইকেট দুটি ছিল এই কৌশলী পরিবর্তনের প্রতীক, যা ইংল্যান্ডের চেনা ছন্দের বিপরীতে বড় ধাক্কা ছিল। পরিসংখ্যানও এই কৌশলের পক্ষে কথা বলে। নিউজিল্যান্ড সিরিজে পেসের বিপক্ষে উইকেটকিপার পেছনে থাকার সময় ইংল্যান্ডের গড় ছিল ২৫.৩৬ (স্ট্রাইক রেট ৫৭.৭৮), কিন্তু কিপার সামনে আসতেই তা নেমে দাঁড়ায় ১৫.২৬-এ। একই সাথে কিউইদের উইকেট নেওয়ার হার ৪৩.৮ থেকে কমে ২৭.৮-এ নেমে আসে।
এই প্রবণতা কেবল একটি সিরিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যাশেজের পর থেকে কিপার পেছনে থাকলে পেসের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের গড় ২৪.৪৮, যা কিপার সামনে থাকলে নেমে যায় ১৯.০-এ। বাজবল যুগের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো বোলারদের লেংথ এলোমেলো করে দেওয়া। ব্যাটাররা ক্রিজ ছেড়ে সামনে বা পেছনে গিয়ে বোলারদের ভালো লেংথের বলকে হাফ-ভলিতে পরিণত করে কিংবা ব্যাক-অফ-লেংথ বলকে পুল শট খেলার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু কিপার সামনে দাঁড়ালে ব্যাটারদের এই আক্রমণাত্মক মুভমেন্ট বন্ধ হয়ে যায়।
ইংল্যান্ডের ব্যাটারদের মধ্যে হ্যারি ব্রুক এই কৌশলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। ২০২২ সালের জুন থেকে পেসের বিপক্ষে ক্রিজ ব্যবহার করে তিনি ১৮৪.৬ স্ট্রাইক রেটে ৯৬ গড়ে ৩৮৪ রান করেছেন। কিপার পেছনে থাকলে প্রতি ৫ বলের ১টিতে তিনি ক্রিজ ব্যবহার করতেন। কিন্তু কিপার সামনে চলে আসার পর তার এই আক্রমণাত্মক মুভমেন্ট প্রায় বিলীন হয়ে যায় এবং তাকে ৯৬%-এর বেশি বল খেলতে হয় প্রথাগত ফ্রন্ট-ফুট বা ব্যাক-ফুট পজিশন থেকে। ফলে তার গড় ৪৭.৭৫ থেকে কমে ২৮.৮-এ নেমে আসে এবং ভুল শট খেলার প্রবণতা বেড়ে যায়।
৬-৮ মিটার লেংথ সাধারণ বোলারদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। বাজবল যুগে ইংল্যান্ড এই লেংথকে সহজেই রান তোলার উৎসে পরিণত করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের সিরিজে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই ৬-৮ মিটার লেংথে ইংল্যান্ডের গড় ছিল মাত্র ১৬.৭৮, যা বাজবল যুগে তাদের সর্বনিম্ন। ৯৬০ বলে মাত্র ৩৮৬ রান তুলতে তারা ২৩টি উইকেট হারায়। অথচ আগের নিউজিল্যান্ড সফরে এই গড় ছিল ৪৮.০৯, ২০২৪-২৫ সালে পাকিস্তানে ৬৯ এবং গত গ্রীষ্মে ভারতের বিপক্ষে ছিল ৩৩.৪৬। কিপার পেছনে থাকার সময় এই লেংথে ইংল্যান্ডের গড় ছিল ২১.১৫, যা কিপার সামনে আসার পর প্রায় অর্ধেক হয়ে ১১.১-এ নেমে আসে (২৭২ বলে ১০ উইকেট)।
নিউজিল্যান্ড যদি এই ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করে থাকে, তবে পাকিস্তান দলে রয়েছে এটি বাস্তবায়নের সবচেয়ে উপযুক্ত বোলার—মোহাম্মদ আব্বাস। আব্বাস তার ক্যারিয়ারে ৩০টি টেস্টের ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী ৫১.১% বল নিখুঁত গুড-লাইন ও গুড-লেংথ করিডোরে ফেলেছেন, যা অন্তত ৫০ ওভার বল করা পেসারদের মধ্যে সর্বোচ্চ। তার ১১৮টি টেস্ট উইকেটের মধ্যে ৬৬টিই এসেছে গুড-লেংথ থেকে, যেখানে তার গড় মাত্র ১৭.৩৯।
ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে আব্বাসের অভিজ্ঞতাও বিশাল। ২০১৮ সাল থেকে হ্যাম্পশায়ার, লেস্টারশায়ার, ডার্বিশায়ার ও নটিংহামশায়ারের হয়ে কাউন্টিতে ৮০ ম্যাচে ২০.৬৪ গড়ে ৩০২ উইকেট নিয়েছেন তিনি। ২০২৫ সালে নটিংহামশায়ারের শিরোপাজয়ী অভিযানে তিনি ছিলেন দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী। পাকিস্তান এই কৌশল ব্যবহার করবে কিনা তা দেখার বিষয়। উইকেটকিপার মোহাম্মদ রিজওয়ান হয়তো ব্লান্ডেল বা অ্যালেক্স ক্যারির মতো উইকেটের কাছে দাঁড়াতে অভ্যস্ত নন, তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে তিনি আব্বাসের বলে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাছাড়া আব্বাসের গতি হেনরির চেয়ে গড়ে ৭-৮ কিমি কম হওয়ায় এটি করা সহজ। হ্যারি ব্রুক ও মোহাম্মদ আব্বাসের এই লড়াইটি হতে যাচ্ছে আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা দ্বৈরথ।

