আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ থাকেন, যারা আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত উদার, দয়ালু ও পরোপকারী। কিন্তু তাদের প্রতিটি ভালো কাজ বা উপকারের পেছনেই যেন কোনো না কোনো গোপন শর্ত লুকিয়ে থাকে। এমন মানুষের করা কোনো সাহায্য পরবর্তীতে আপনার বিরুদ্ধেই দরকষাকষির হাতিয়ার কিংবা মানসিক ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই বিশেষ ধরনের জটিল ব্যক্তিত্বকে বলা হয় ‘রিসেন্টফুল মার্টার’ বা ক্ষুব্ধ আত্মত্যাগী নার্সিসিস্ট।
এই ধরনের নার্সিসিস্টরা মূলত তাদের চরম অহমিকা ও নিজেদের জাহির করার প্রবণতাকে লোকদেখানো ত্যাগ এবং পরোপকারের আড়ালে লুকিয়ে রাখেন। তারা আপনার মতামত, প্রয়োজন বা ইচ্ছার তোয়াক্কা না করেই নানা ধরনের সুবিধা বা অনাকাঙ্ক্ষিত উপহার দিতে চান। আসলে তাদের এই আচরণের মূল উদ্দেশ্য আপনাকে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করা নয়, বরং নিজেদের জন্য প্রশংসা, সহানুভূতি, মনোযোগ এবং সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করা—মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘নার্সিসিস্টিক সাপ্লাই’ বা আত্মমুগ্ধতার খোরাক বলা হয়।
সাইকোথেরাপিস্ট এবং ‘ইফ অনলি আইড নোন!’ (যদি আমি আগে জানতাম!) বইয়ের বিখ্যাত লেখক চেলসি ব্রুক কোল জানান, এই ধরনের মানুষেরা মূলত ছদ্মবেশী নার্সিসিস্ট। তারা সাধারণত অন্যান্য সাধারণ নার্সিসিস্টদের মতো চিৎকার-চেঁচামেচি করেন না বা নিজেদের অহংকার প্রকাশ্যভাবে প্রদর্শন করেন না। বাইরে থেকে তাদের অত্যন্ত বিনয়ী, সাহায্যকারী ও দয়ালু মনে হতে পারে। তবে তাদের সমস্ত ‘সাহায্য’ আসে কেবল নিজেদের শর্তে, যা প্রায়শই গ্রহীতার প্রকৃত চাহিদা বা ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে থাকে। ফলে সাধারণ নার্সিসিস্টদের চেয়ে এদের চিহ্নিত করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।
আরেকজন প্রখ্যাত সাইকোথেরাপিস্ট এবং ‘হিলিং ফ্রম টক্সিক রিলেশনশিপস: ১০ এসেনশিয়াল স্টেপস টু রিকভার ফ্রম গ্যাসলাইটিং, নার্সিসিজম, অ্যান্ড কোডিপেন্ডেন্সি’ (বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে মুক্তি: গ্যাসলাইটিং, নার্সিসিজম এবং সহ-নির্ভরশীলতা থেকে পুনরুদ্ধারের ১০টি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ) বইয়ের লেখক স্টিফানি সার্কিস এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই ক্ষুব্ধ আত্মত্যাগীরা মনে মনে একটি খাতা বা হিসাবের খতিয়ান বজায় রাখেন, যেখানে স্পষ্ট লেখা থাকে কে তাদের কাছে কতটা ঋণী রয়ে গেল। কেউ যখন তাদের এই ফাঁদে পা দিতে বা তাদের শর্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন তাদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম হয়।
বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ডুরভাসুলার মতে, এই শ্রেণির মানুষেরা নিজের পছন্দমতো খাবার রান্না করে আপনার ফ্রিজ ভর্তি করে রাখতে পারে, যা হয়তো আপনি কখনোই খাবেন না বা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী নয়। এমনকি আপনার অত্যন্ত ব্যস্ততার দিনে তারা কোনো পার্টির আয়োজন করতে পারে কিংবা আপনার অসময়ে কোনো ছুটির পরিকল্পনা করে ফেলতে পারে। আর আপনি যদি কোনোভাবে তাদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত উপকারে আপত্তি জানান বা তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন, তবে পরিস্থিতি চরম রূপ নিতে পারে।
আপত্তি জানালে তাদের ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত নোংরা রূপ নেয় বলে সতর্ক করেছেন ডুরভাসুলা। তারা তখন রেগে গিয়ে আপনাকে অকৃতজ্ঞ, রূঢ়, স্বার্থপর বা নিষ্ঠুর বলে অভিযুক্ত করতে পারে। অনেক সময় তারা আপনার সাথে কথা বলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, এক শব্দে উত্তর দেয়, কিংবা নিজেকে চরম ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়, যাতে আপনার মনে তীব্র অপরাধবোধ তৈরি হয় এবং আপনি তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন।

