ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে জয়ের নতুন উপায় হিসেবে একটি অর্থনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধ ইরানকে নতজানু করতে ব্যর্থ হওয়ার পর, ট্রাম্প প্রশাসন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে একটি নতুন অভিযান শুরু করেছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার লক্ষ্য হলো ইরানকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা। যারা তেহরানের সাথে ব্যবসা চালিয়ে যাবে, তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
ইরানের অর্থনীতি বছরের পর বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ এবং কয়েক মাস ধরে চলা মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত। ইরানি কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, তেল রপ্তানি এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ায় সাধারণ ইরানিরা এমনিতেই চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। নতুন এই অর্থনৈতিক শ্বাসরোধের নীতি তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে ইরানি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই কৌশলটি উল্টো ফল দিচ্ছে। তেহরানের ভাষ্যমতে, প্রতিটি নতুন চাপ তাদের আত্মরক্ষার সংকল্প আরও দৃঢ় করছে। ইরানের নতুন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজায়ি ওয়াশিংটনের এই অর্থনৈতিক প্রচারণাকে ‘যুদ্ধের শামিল’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, তেহরান তার স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালীর বিকল্প রুটগুলোতে তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এই বক্তব্যগুলোকে কেবল অভ্যন্তরীণ প্রচার হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত বার্তা যে, ইরান অর্থনৈতিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে না পারলেও, ওয়াশিংটনের জন্য এই অবরোধকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার একটি বড় দুর্বলতা হলো চীনের অবস্থান। স্কট বেসেন্টের হুমকি কার্যকর করতে হলে ওয়াশিংটনকে চীনসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকে এই অবরোধে শামিল করতে হবে। কিন্তু বেইজিং উল্টো পথে হাঁটছে। তারা তাদের কোম্পানিগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা না মানার নির্দেশ দিয়েছে এবং চীনা স্বার্থে আঘাত এলে ‘প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা’ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এমনকি সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানার দায়ে জরিমানা করার ঘটনাও বেইজিং তুলে ধরেছে। এই পরিস্থিতি ওয়াশিংটনকে একটি কঠিন নির্বাচনের মুখে ঠেলে দিয়েছে: হয় ইরান ও চীনের বাণিজ্য মেনে নেওয়া, নতুবা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ঝুঁকি নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
নির্বাচন সামনে রেখে হোয়াইট হাউস বড় ধরনের কোনো উত্তেজনার ঝুঁকি এড়াতে চাইছে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে। তেহরানও বিষয়টি জানে। তারা বাজি ধরছে যে, তারা দীর্ঘমেয়াদী এই চাপ সহ্য করতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তাদের সহযোগীরা সংঘাতের চেয়ে সমঝোতাকে বেশি গুরুত্ব দেবে। বর্তমানে এটি একটি বিপজ্জনক ধৈর্য পরীক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে ওয়াশিংটন বাজি ধরেছে ইরানের অর্থনীতি আগে ভেঙে পড়বে, আর তেহরান বাজি ধরেছে মার্কিন সহনশীলতা আগে শেষ হবে।

