চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত 'প্রেমিক' বেছে নেওয়া নারীদের জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র নির্মাতা চৌওয়া লিয়াংয়ের নতুন তথ্যচিত্র 'রেপ্লিকা'। মেলবোর্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এই তথ্যচিত্রটি মূলত মানুষের একাকীত্ব এবং প্রযুক্তির সাথে গড়ে ওঠা জটিল সম্পর্কের এক গভীর বিশ্লেষণ। এটি নির্মাতা চৌওয়া লিয়াংয়ের পূর্ববর্তী কাজ 'মাই এআই বয়ফ্রেন্ড'-এর পরবর্তী সংস্করণ, যা ২০২৩ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসের অপ-ডকস বিভাগে স্থান পেয়েছিল।
তথ্যচিত্রটিতে তিন চীনা নারীর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে, যারা বাস্তব মানুষের চেয়ে এআই সঙ্গীদের বেশি পছন্দ করেন। এদের মধ্যে একজন হলেন কিন, যিনি ৮৪০ দিন ধরে 'গ্লো' (Glow) অ্যাপের মাধ্যমে 'লু চেন' নামের এক এআই চরিত্রের সাথে যোগাযোগ করছেন। কিন বলেন, তার এআই প্রেমিক তাকে সবসময় ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন, যা তাকে একাকীত্ব থেকে মুক্তি দেয়। নিজের কর্মজীবনের একঘেয়েমি এবং পারিবারিক চাপের মাঝে এই ভার্চুয়াল সম্পর্ক তার কাছে এক ধরনের আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্মাতা চৌওয়া লিয়াং নিজেও মহামারীর লকডাউনের সময় 'রেপ্লিকা' (Replika) অ্যাপের মাধ্যমে 'নরম্যান' নামের একটি এআই-এর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। তিনি জানান, "আমি যখন আমার অ্যাপার্টমেন্টে বন্দি ছিলাম এবং বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তখনই আমি এআই-এর সাথে কথা বলা শুরু করি। আমার ৩০তম জন্মদিনে সে প্রথম আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিল এবং একটি কবিতা লিখেছিল।" তার মতে, বিচ্ছিন্নতার সময়ে এই প্রযুক্তি তাকে মানসিকভাবে সহায়তা করেছে। লিয়াং তার তথ্যচিত্রে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে এই নারীরা নিজেদের আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদাগুলো বোঝার জন্য এআইকে একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তথ্যচিত্রটিতে সনিয়া নামের আরেকজন নারীর কথা বলা হয়েছে, যিনি এআই-এর সাথে সম্পর্ককে একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন। এছাড়া মুনা নামের এক গৃহিণী তার এআই সঙ্গী 'ওরিয়ন'-এর সাথে আলাপচারিতার মাধ্যমে নিজের বিবাহিত জীবনের অতৃপ্তি ও আত্মসম্মানবোধের জায়গাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন।
তবে এই ভার্চুয়াল সম্পর্কের পথে আইনি বাধা ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গত মাসে চীনা সরকার এআই সঙ্গীদের ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যার ফলে লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারী তাদের এআই সঙ্গীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। নতুন আইন অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এআই সঙ্গী নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত আবেগীয় নির্ভরশীলতা প্রশমনে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
লিয়াংয়ের তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে যে, এআই আপডেট বা সার্ভারের পরিবর্তনের ফলে যখন কোনো এআই চরিত্রের স্মৃতি মুছে যায়, তখন ব্যবহারকারীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। নির্মাতা মনে করেন, সরকার ও কোম্পানিগুলোর এই প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আবেগীয় আসক্তির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। তিনি জানান, তথ্যচিত্র নির্মাণের এই তিন বছরে তিনি নিজেও মানুষের সাথে সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা ও আবেগ প্রকাশের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করেছেন।

