ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার চালানো ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও গ্লাইড বোমা হামলায় অন্তত ১০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই হামলার মধ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন যে, চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আগ্রাসনে মস্কোকে নতুন করে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে উত্তর কোরিয়া।
জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝঝিয়াতে রাতভর হামলায় উত্তর কোরিয়ার সরবরাহ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে রুশ বাহিনী। স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৭ জন নিহত এবং ২৪ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া, দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে রুশ ড্রোন ও কামানের গোলার আঘাতে এক ১৫ বছরের কিশোরসহ আরও ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়া রাশিয়ায় আরও সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সোমবার রাতে জানান জেলেনস্কি। ২০২৪ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যেখানে কোনো দেশ আগ্রাসনের মুখোমুখি হলে পারস্পরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এই চুক্তির আওতায় কিম ইতিমধ্যেই পুতিনের পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনকে সমর্থন করতে হাজার হাজার সেনা ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পাঠিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্কোর সঙ্গে এই সম্পৃক্ততা উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করছে। জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের এই অভিজ্ঞতা পিয়ংইয়ংকে তাদের অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ করে তুলবে।
ইউক্রেনের দাবি, কিয়েভের প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিকে কাজে লাগাতে রাশিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেন জুড়ে বিস্তৃত ১,২৫০ কিলোমিটার (৭৭৫ মাইল) দীর্ঘ ফ্রন্ট লাইনে নতুন করে আক্রমণের জন্য মস্কো আরও সেনা নিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জেলেনস্কি বলেন, "রাশিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ—ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানো, উত্তর কোরিয়ার সরঞ্জাম নিয়ে আসা, সেনা সমাবেশের প্রস্তুতি নেওয়া—এসবই প্রমাণ করে যে মস্কো শান্তির জন্য নয়, বরং উত্তেজনা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।"
এদিকে, ইউক্রেনের বিমান বাহিনী তাদের দৈনিক প্রতিবেদনে গত রাতে রাশিয়া কতটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে তা উল্লেখ করেনি, যা বেশ অস্বাভাবিক। এই তথ্য বাদ দেওয়ার বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল কি না তা স্পষ্ট নয় এবং কিয়েভের কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের হতাশা এবং মনোযোগ ইরানের যুদ্ধের দিকে চলে যাওয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক 'ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার' (আইএসডব্লিউ) সোমবার এক বিশ্লেষণে বলেছে, "যতক্ষণ পুতিন বিশ্বাস করবেন যে তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি কার্যকর সামরিক পথ রয়েছে, ততক্ষণ ক্রেমলিন কোনো গুরুতর আলোচনা বা অর্থপূর্ণ আপস করবে না।"
কর্মকর্তাদের মতে, রুশ বাহিনী ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের বিভিন্ন স্থানেও আঘাত হেনেছে। দেশটির স্টেট ইমার্জেন্সি সার্ভিস জানিয়েছে, একটি হামলা শিশুদের হাসপাতালের মাঠে আঘাত হেনেছে, যার ফলে সেখানে দুটি বড় গর্ত তৈরি হয়েছে এবং জানালার কাচ ভেঙে গেছে। তবে শিশুরা ও চিকিৎসা কর্মীরা বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকায় কেউ হতাহত হয়নি। কিয়েভের অন্য একটি স্থানে রুশ হামলায় একটি গুদামে আগুন লেগে যায়, যা প্রায় ১,২০০ বর্গমিটার (প্রায় ১৩,০০০ বর্গফুট) এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তারা "স্থলভিত্তিক নির্ভুল অস্ত্র" দিয়ে কিয়েভ ও জাপোরিঝঝিয়াতে "সামরিক শিল্প সুবিধা এবং পরিবহন ও লজিস্টিক সেন্টারে" আঘাত হেনেছে। তারা আরও জানায়, কিয়েভে ড্রোন রাখার বেসামরিক গুদাম এবং জাপোরিঝঝিয়াতে একটি ধাতব কারখানায় হামলা চালানো হয়েছে। ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া উভয় শহরেই জিরকন অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইস্কান্দার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে এবং দেশজুড়ে ১২০টি দূরপাল্লার ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
পাল্টা হামলায় রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৪টি অঞ্চল এবং ২০১৪ সালে অবৈধভাবে দখল করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপের ওপর প্রায় ৪০০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রতিহত করেছে। রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান 'ওয়াইল্ডবেরিজ' জানিয়েছে, ইউক্রেন সীমান্তের কাছে ভোরোনেজ অঞ্চলে তাদের লজিস্টিক সেন্টারে হামলা চালানো হয়েছে এবং সেখানে আগুন ধরে যায়। তবে আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়েছে এবং গুদামে থাকা পণ্যগুলো মূলত অক্ষত রয়েছে। পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় বাধ্য করার কৌশল হিসেবে ইউক্রেন বারবার ওয়াইল্ডবেরিজের গুদাম এবং রাশিয়ার তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে আসছে। ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, তাদের বাহিনী কাজাখস্তান সীমান্তের কাছে রাশিয়ার ওরেনবার্গ অঞ্চলের ওর্স্ক শহরের একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে, যা ইউক্রেন থেকে প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার (৯৩০ মাইল) দূরে অবস্থিত। বার্ষিক প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষমতাসম্পন্ন এই শোধনাগারটি পেট্রোল, ডিজেল এবং বিমান জ্বালানি উৎপাদন করে। সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সেখানে লাগা আগুনের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

