প্রযুক্তির জয়জয়কার নিয়ে একসময় যে আশাবাদ ছিল, আজ তার জায়গা নিয়েছে এক গভীর উদ্বেগ। পঁচিশ বছর আগে যেখানে ১০ জনের মধ্যে ৮ জন আমেরিকান নতুন সহস্রাব্দে বিজ্ঞানের জয়জয়কার প্রত্যাশা করেছিলেন, সেখানে বর্তমান বাস্তবতায় তারা বিগ টেক কোম্পানির আগ্রাসী বিস্তারের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং এআই-চালিত ভবিষ্যতের চেয়ে ভীতিই এখন বেশি কাজ করছে।
এই ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদে। বর্তমানে এআই এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চাহিদা মেটাতে ঐতিহাসিক হারে এই বিশাল স্থাপনাগুলো তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু গ্যালাপের এক জরিপ বলছে, প্রায় ৭১ শতাংশ আমেরিকান তাদের এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধী, যার মধ্যে ৪৮ শতাংশ মানুষ এর তীব্র বিরোধিতা করছেন। স্থানীয়রা মনে করছেন, এই কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ ও পানির সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং শব্দ ও পরিবেশ দূষণ ছড়াচ্ছে। এরই মধ্যে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ৭৫টি ডেটা সেন্টার প্রকল্প স্থানীয় বিরোধিতার কারণে বাধাগ্রস্ত বা স্থগিত হয়েছে। তবুও বর্তমানে ১,৫০০টিরও বেশি ডেটা সেন্টার নির্মাণের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রযুক্তির এই নেতিবাচক প্রভাব কেবল ডেটা সেন্টারে সীমাবদ্ধ নেই। ফ্লক সেফটির এআই-চালিত নজরদারি ক্যামেরার ব্যবহার নিয়েও জনমনে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কোম্পানিটি ৪৯টি অঙ্গরাজ্যে ১ লাখ ২০ হাজার ক্যামেরা বসিয়েছে, যা প্রতি মাসে ২০ বিলিয়ন যানবাহনের তথ্য স্ক্যান করে। গোপনীয়তা লঙ্ঘন, পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অভিবাসন কর্তৃপক্ষের তথ্য পাওয়ার মতো ঘটনায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। প্রায় ১০০টি এলাকা ফ্লক সেফটির সাথে চুক্তি বাতিল বা স্থগিত করেছে। অনেক জায়গায় ক্যামেরা ভাঙচুর ও অপসারণের মতো ঘটনাও ঘটছে।
এই পরিস্থিতি এক অনন্য রাজনৈতিক জোটের জন্ম দিয়েছে। বার্নি স্যান্ডার্স, রন ডিস্যান্টিস, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং গ্রেগ অ্যাবটের মতো রাজনীতিবিদরা এই প্রযুক্তির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। নর্থ ক্যারোলিনার হেন্ডারসনভিলে রক্ষণশীল কৃষক অস্টিন রোডস এবং প্রগতিশীল প্রতিবেশী টিয়ারনান টার্নারের মতো মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফ্লক ক্যামেরার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। এমনকি মেটা-র বিরুদ্ধে ৪৮টি অঙ্গরাজ্যের করা মামলায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা হয়েছে।
টেক কোম্পানিগুলোর প্রধানরা অবশ্য এই উদ্বেগগুলোকে অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। স্যাম অল্টম্যানের মতো প্রযুক্তি নেতারা দাবি করছেন, এআই ক্যান্সার নিরাময় বা শিক্ষার মানোন্নয়নে বিপ্লব ঘটাতে পারে। তবে সাধারণ আমেরিকানরা এআই-জনিত কর্মসংস্থান হারানো এবং নিম্নমানের কনটেন্ট বা 'এআই স্লপ' নিয়ে বিরক্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই আন্দোলন কেবল নির্দিষ্ট প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি বিগ টেক কোম্পানির একচেটিয়া ক্ষমতা এবং নজরদারি পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে মানুষের সামগ্রিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
