কলার জনপ্রিয়তা ২০২৬ সালে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এটিকে বছরের অন্যতম সেরা ভাইরাল স্বাদ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, এমনকি বিলাসবহুল ব্র্যান্ড প্রাডার নতুন লিপবাম ফ্লেভার হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে কলা। তবে সম্প্রতি 'মেল রবিন্স পডকাস্ট'-এ বায়োমেডিকেল বিজ্ঞানী ড. রোন্ডা প্যাট্রিক এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। তিনি জানান, ব্লুবেরির স্মুদিতে কলা যোগ করলে বেরির পুষ্টিগুণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। তাঁর এই দাবি প্রিয় এই ফালের মিশ্রণটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় তৈরি করেছে।
ড. প্যাট্রিকের ব্যাখ্যানুযায়ী, কলায় থাকা 'পলিফেনল অক্সিডেস' (পিপিও) নামক এনজাইম বা উৎকর্ষক ব্লুবেরির মতো উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা পলিফেনল বা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলোকে ভেঙে ফেলে। পডকাস্টে তিনি বলেন, পলিফেনল অক্সিডেস মূলত এমন একটি এনজাইম যা পলিফেনলকে ভেঙে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্লুবেরির সঙ্গে কলা মেশালে পলিফেনলের পরিমাণ অনেক কমে যায়। ফলে কলা মূলত ব্লুবেরির উপকারিতা নষ্ট করে দিচ্ছে।
ড. প্যাট্রিকের এই দাবির মূল ভিত্তি সম্ভবত ২০২৩ সালের একটি গবেষণা, যেখানে পলিফেনল অক্সিডেস কীভাবে শরীরে 'ফ্ল্যাভানল' নামক বিশেষ পলিফেনল শোষণে বাধা দেয় তা খতিয়ে দেখা হয়েছিল। ওই গবেষণায় দেখা যায়, যারা ফ্ল্যাভানল যুক্ত কলার স্মুদি পান করেছিলেন, তাদের রক্তে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা বেরি স্মুদি পানকারীদের তুলনায় বেশ কম ছিল। তবে এই গবেষণার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করার বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির অফিস ফর সায়েন্স অ্যান্ড সোসাইটির পরিচালক ও বিজ্ঞান গবেষক ড. জো শোয়ার্জ বলেন, ওই গবেষণায় গবেষকরা কখনই কলা ও ব্লুবেরি একসঙ্গে মিশিয়ে স্মুদি তৈরি করেননি। তাছাড়া, গবেষণাটি মাত্র আটজন মানুষের ওপর চালানো হয়েছিল, যা কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য একেবারেই যথেষ্ট নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ব্লুবেরিতে বিভিন্ন ধরণের পলিফেনল থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো 'অ্যান্থোসায়ানিন', যা ব্লুবেরির গাঢ় রঙের জন্য দায়ী এবং এটি হৃদরোগের ঝুঁকি ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু ওই গবেষণায় পরিমাপ করা হয়েছিল ফ্ল্যাভানল, যা এমনকি ব্লুবেরির প্রধান উপাদানও নয়। উপরন্তু, গবেষণাটিতে ব্যবহৃত ফ্ল্যাভানল কোকো থেকে নেওয়া হয়েছিল এবং গবেষণাটির অর্থায়ন করেছিল মার্স (Mars) নামক একটি চকলেট ও ফ্ল্যাভানল সাপ্লিমেন্ট প্রস্তুতকারক কোম্পানি।
ড. প্যাট্রিকের স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান 'ফাউন্ডমাইফিটনেস'-এর মুখপাত্র ড্যান ইমেইলের মাধ্যমে জানান, এই এনজাইম যে কিছু পলিফেনল ভেঙে ফেলে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই এবং এটি কেবল একটি গবেষণার ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে মিনিয়াপোলিসের নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান অ্যালিসা নর্থরপ বলেন, খাবারে পুষ্টি উপাদানের পারস্পরিক বিক্রিয়া অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। যেমন ভিটামিন সি শরীরে আয়রন শোষণ বাড়ায়, আবার পালং শাকের অক্সালেট ক্যালসিয়ামের শোষণ কমিয়ে দেয়। তাই বলে প্রতিটি খাবারের সংমিশ্রণ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।
সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়ার ডায়েটিশিয়ান শেরিল গাও জানান, কলায় রয়েছে পটাসিয়াম, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেসিয়াম এবং প্রায় ৩ গ্রাম ফাইবার। স্মুদিতে প্রাকৃতিক মিষ্টি ও ঘন টেক্সচার আনতে কলার জুড়ি মেলা ভার। নর্থরপ যোগ করেন, বেশিরভাগ মানুষ দৈনিক প্রয়োজনীয় ফল ও সবজি খান না। যদি কলা যোগ করার কারণে একটি স্মুদি সুস্বাদু হয় এবং কেউ ফল খেতে উৎসাহিত হন, তবে সেটাই সবচেয়ে বড় জয়। যদি কেউ সত্যিই ব্লুবেরির ফ্ল্যাভানল নিয়ে চিন্তিত থাকেন, তবে কলার পরিবর্তে আম বা আনারসের মতো কম পিপিও সমৃদ্ধ ফল ব্যবহার করতে পারেন। ড. শোয়ার্জের মতে, সামগ্রিক ডায়েটের ক্ষেত্রে কলা ও বেরির এই পারস্পরিক প্রভাব খুবই সামান্য বা নগণ্য।
বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ থেকে জানা যায় যে, গ্রিন টি, কোকো এবং আপেলের মতো খাবার থেকে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৬০০ মিলিগ্রাম ফ্ল্যাভানল গ্রহণ করা কার্ডিওমেটাবলিক (হৃদযন্ত্র ও বিপাকীয়) স্বাস্থ্যকে উন্নত করতে পারে, যার মধ্যে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের সম্ভাব্য উন্নতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

