কট্টর রক্ষণশীল মার্কিন যুব সংগঠন 'টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ' (TPUSA)-র প্রতিষ্ঠাতা চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ইউটা ভ্যালি ইউনিভার্সিটিতে ৩,০০০ শ্রোতার সামনে বক্তব্য দেওয়ার সময় কার্ককে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৩১ বছর বয়সী এই নেতার মৃত্যুর পর তার ৩৬ বছর বয়সী বিধবা স্ত্রী এরিকা কার্ক সংগঠনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই সংগঠনটিকে এখন মোকাবিলা করতে হচ্ছে নিজেদেরই এক সময়ের সহযোগীদের ছড়ানো নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।
অ্যারিজোনার ফিনিক্সভিত্তিক এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে, যখন চার্লির বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। সহ-প্রতিষ্ঠাতা ৭১ বছর বয়সী বিল মন্টগোমারির পরামর্শে কলেজ শিক্ষা বাদ দিয়ে তিনি এই অলাভজনক রাজনৈতিক উদ্যোগ শুরু করেন। শুরুতে ধনী রক্ষণশীল দাতাদের লক্ষ্য করে কাজ শুরু করা চার্লি কার্ক দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তি বুঝতে পারেন। লি হ্যানলি ও তার স্ত্রী অ্যালি হ্যানলির মতো বড় দাতাদের সমর্থন এবং রক্ষণশীল সম্মেলনগুলোতে ফোস্টার ফ্রিসের মতো কোটিপতিদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে সংগঠনটিকে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। বর্তমানে এই সংগঠনের বার্ষিক বাজেট ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং কর্মী সংখ্যা ৪০০-র ওপরে। এর রাজনৈতিক শাখা 'টার্নিং পয়েন্ট অ্যাকশন' রিপাবলিকান ভোটারদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
২০২০ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়ের পর কার্ক ও তার সংগঠন 'স্টপ দ্য স্টিল' আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত কার্কের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং ওহাইওর সিনেটর জেডি ভ্যান্সের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কার্কের মৃত্যুর পর জেডি ভ্যান্স ও তার স্ত্রী ঊষা ভ্যান্স ব্যক্তিগতভাবে ইউটায় গিয়ে এরিকাকে সান্ত্বনা দেন এবং কার্কের মরদেহ এয়ার ফোর্স টু-তে করে অ্যারিজোনায় ফিরিয়ে আনেন। কার্কের স্মরণসভায় প্রায় ৭৫,০০০ মানুষ অংশ নেয়, যেখানে এরিকা কার্ক তার স্বামীর হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রক্ষণশীল নারীত্বের এক নতুন প্রতীক হয়ে ওঠেন।
তবে কার্কের মৃত্যুর পর কট্টর ডানপন্থী জোটের ফাটলগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে বামপন্থীরা কার্কের অতীত বিতর্কিত মন্তব্যগুলো—যেমন কৃষ্ণাঙ্গ পাইলট, সমকামিতা বা গর্ভপাত সংক্রান্ত মন্তব্য—সামনে এনে সমালোচনা করছে, অন্যদিকে সংগঠনের ভেতরেই শুরু হয়েছে তীব্র ষড়যন্ত্র তত্ত্বের যুদ্ধ। কার্কের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং টার্নিং পয়েন্টের সাবেক যোগাযোগ পরিচালক ক্যানডেস ওয়েন্স দাবি করতে শুরু করেছেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে এরিকা কার্কের হাত থাকতে পারে। এছাড়া টাকার কার্লসন ও জো রোগানের মতো প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত থাকতে পারে, কারণ মৃত্যুর আগে কার্ক ইসরায়েল নীতি নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।
এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রভাব এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে, টার্নিং পয়েন্টের প্রধান মাঠ কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু সাইফার জানিয়েছেন, তাদের কর্মীরা এবং এমনকি পরিবারের সদস্যরাও এখন একে অপরের দিকে আঙুল তুলছেন। ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করার কারণে সম্প্রতি সংগঠনটি তাদের সাতজন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করেছে। তা সত্ত্বেও টার্নিং পয়েন্টের বর্তমান চিফ অপারেটিং অফিসার জাস্টিন স্ট্রাইফ দাবি করেছেন যে, চার্লির মৃত্যুর পর তাদের অনুদান সংগ্রহ এবং ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। চার্লি কার্কের মৃত্যুর এক বছর পর টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ হয়তো সাংগঠনিকভাবে টিকে আছে, কিন্তু যে রাজনৈতিক বিপ্লবের বীজ কার্ক বুনেছিলেন, তা এখন নিজেদেরই গ্রাস করতে শুরু করেছে।

