যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিশাল জয়ের পর মার্কিন কংগ্রেসে নিজেদের নতুন ক্ষমতা প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রায় দুই বছর ধরে "ব্যয়, বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি" নিয়ে ধারাবাহিক সমালোচনার পর প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে দলটি। তবে ক্ষমতা ফিরে পেলেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) শুরুর কোনো পরিকল্পনা ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বের নেই। বরং স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং আইনপ্রণেতাদের শেয়ার কেনাবেচা ও সুপার প্যাকের মতো দুর্নীতি বন্ধের বিলে নজর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতারা।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই মধ্যবর্তী নির্বাচনটি ছিল গত ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকা কোনো ক্ষমতাসীন দলের জন্য সবচেয়ে বড় পরাজয়। এতে রিপাবলিকান পার্টি দশকের পর দশক ধরে নিজেদের দখলে রাখা সিনেট আসন এবং বিশেষভাবে নিজেদের অনুকূলে তৈরি করা হাউস আসনগুলো হারিয়েছে। এ জয়ের ফলে নতুন বছর কংগ্রেসে হাউস স্পিকার হতে যাওয়া হাকিম জেফ্রিস এবং সিনেটের সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা চাক শুমার ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টির সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে ডেমোক্র্যাটদের অর্জন সত্ত্বেও তাদের ক্ষমতা পুরোপুরি অসীম নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হোয়াইট হাউসে বহাল থাকবেন এবং বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া পাস হওয়া যেকোনো বিলে ভিটো প্রয়োগের ক্ষমতা তার হাতে থাকবে। এ ছাড়া সিনেটে আইন পাসে বাধা দেওয়ার 'ফিলিবাস্টার' কৌশল এখনও কার্যকর রয়েছে, যা ব্যবহারের জন্য অন্তত ৬০টি ভোটের প্রয়োজন। চলমান ভোট গণনা শেষ হলে ডেমোক্র্যাট ও তাদের সহযোগীদের সিনেটে মোট ৫৬টি আসন থাকবে। ফলে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা সহজেই ডেমোক্র্যাটদের বিলে ফিলিবাস্টার আনতে পারবেন।
ডেমোক্র্যাটিক নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে এসব বাধা সত্ত্বেও তারা নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন থেকে সরে আসবেন না। হাকিম জেফ্রিস বলেন, "আমরা দেশের মানুষের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম এবং তা পূরণ করতে আমরা প্রতিশ্রুতবদ্ধ।" তিনি আরও জানান, ট্রাম্পকে অভিশংসন করার বিষয়ে প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক ককাসের কোনো সদস্যের সঙ্গে তার আলোচনা হয়নি। তারা মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ওপর জোর দিচ্ছেন।
প্রগতিশীল সংগঠন সেন্টার ফর আমেরিকান প্রোগ্রেসে এক বক্তব্যে চাক শুমার বলেন, ডেমোক্র্যাটদের পুরো কর্মপরিকল্পনা তিনটি মূল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে—খরচ কমানো, সরকার পরিচালনা সচল রাখা এবং দুর্নীতি দূর করা। তিনি উল্লেখ করেন, আমেরিকানদের জীবনযাত্রার খরচ কমানো কিংবা ওয়াশিংটনের দুর্নীতি দূর করার উদ্যোগে ট্রাম্প বাধা দিতে পারেন। তবে ট্রাম্প যদি ভিটো দেন, তাহলে ২০২৮ সালের নির্বাচনে সাধারণ জনগণ তাকে ও তার দলকে কঠোর জবাব দেবে। ইতোমধ্যে ২০২৮ সালের নির্বাচনে পুনরায় প্রার্থী হতে না পারা ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় "ভিটো" লেখা একটি লাল ক্যাপের ছবি পোস্ট করেছেন, আবার ক্ষেত্রবিশেষে ডেমোক্র্যাটদের সাথে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
দলের পরবর্তী কৌশল বর্ণনা করতে গিয়ে কংগ্রেসনাল প্রোগ্রেসিভ ককাসের চেয়ারম্যান গ্রেগ কাসার বলেন, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীরা যেন প্লাস্টিকের স্ট্র নিষেধাজ্ঞার মতো তুচ্ছ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে না পড়েন। বরং হাউস ও সিনেট থেকে পাস হওয়া বিল ট্রাম্পের টেবিলে পাঠাতে চান তারা। যদি ট্রাম্প অহেতুক দাম বাড়ানো (প্রাইস গজিং), সুপার প্যাক এবং আইনপ্রণেতাদের শেয়ার লেনদেন নিষিদ্ধের বিলে ভিটো দেন, তবে সেটাই ২০২৮ সালের নির্বাচনের মূল এজেন্ডা হবে এবং ২০২৯ সালে তা আইনে পরিণত হবে।
প্রতিনিধি পরিষদের জুডিশিয়ারি কমিটির সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধান জেমি রাস্কিন ইঙ্গিত দিয়েছেন, নতুন বছরে ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের জন্য সমন (সাবপিনা) জারি করা হবে। এর আগে সংখ্যালঘু দলে থাকা অবস্থায় রাস্কিন ট্রাম্প প্রশাসনকে ২০০টিরও বেশি তথ্য চাওয়া সংক্রান্ত চিঠি পাঠালেও সেগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না, যা এখন বদলে যাবে।
অন্যদিতে স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার খরচ কমানো নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রধান ইস্যু ছিল। গত বছর এসিএ ভতুর্কি বাড়ানোর ডেমোক্র্যাটিক দাবির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড দীর্ঘ মেয়াদী সরকারি অচলাবস্থা (শাটডাউন) তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি রিপাবলিকানদের মেডিকেড ছাঁটাই পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন ডেমোক্র্যাটরা। এছাড়া ইরানের সাথে যুদ্ধ বন্ধ সংক্রান্ত একটি সামরিক ক্ষমতা প্রস্তাব কংগ্রেসে পাস হলেও ট্রাম্প তা উপেক্ষা করেছিলেন।
দলের ভেতরে প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে মতভিন্নতা থাকলেও ডেমোক্র্যাট নেতারা ঐক্যের বার্তা দিচ্ছেন। নিউ ডেমোক্র্যাট জোটের নবীন আইনপ্রণেতাদের নেতা ক্রিস্টেন ম্যাকডোনাল্ড রিভেট বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে সবাই বড় পরিবর্তন চান। কেউ 'সবার জন্য মেডিকেয়ার', আবার কেউ 'যাদের প্রয়োজন তাদের জন্য মেডিকেয়ার' নিয়ে কথা বলছেন। তিনি এটিকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখে একটি গঠনমূলক বিতর্ক হিসেবে আখ্যা দেন। প্রথম মেয়াদে সিনেট রিপাবলিকানদের কারণে দুটি অভিশংসন মামলা থেকে রেহাই পেলেও, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আইন ও সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে ডেমোক্র্যাটরা তার রাজনৈতিক ও নীতিগত মোকাবিলাতেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।

