ফ্রান্সে ল্য করবুসিয়েরের বিখ্যাত সামাজিক আবাসন এখন বাসিন্দাদের জন্য উত্তপ্ত নরক

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ফিরমিনি (Firminy) শহরের পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে স্থপতি ল্য করবুসিয়েরের (Le Corbusier) শেষ সৃষ্টি ‘ল্যুনিত দে হাবিতাসিওঁ’ (l’Unité d’Habitation)। লোহা ও ইস্পাত শিল্পের পতনের পর কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফিরমিনির জনসংখ্যা কয়েক দশক ধরে কমছে। এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা উন্নত সুযোগের খোঁজে প্রতিবেশী সাঁত-এতিয়েন (Saint-Étienne) বা ওত-লোয়ারের (Haute-Loire) গ্রামাঞ্চলে চলে যাচ্ছেন। তবে এই শহরের অন্যতম গর্বের প্রতীক হলো কংক্রিটের তৈরি এই বিশাল ভবনটি। এটি মূলত সাধারণ মানুষের বসবাসের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যার দুই-তৃতীয়াংশ ফ্ল্যাট সামাজিক আবাসন বা ‘এইচএলএম’ (HLM) হিসেবে বরাদ্দ এবং বাকি অংশ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন। ১৯৯৩ সালে এই ভবনের সম্মুখভাগ এবং ছাদকে ফ্রান্সের ‘ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ’ (monuments historiques) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

১৯৬০-এর দশকের জলবায়ুর কথা মাথায় রেখে তৈরি করা এই ভবনটি বর্তমানের তীব্র দাবদাহে বাসিন্দাদের জন্য এক দুঃসহ নরকে পরিণত হয়েছে। ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে সুরক্ষার কঠোর নিয়মের কারণে ভবনটিতে কোনো পরিবর্তন আনার সুযোগ নেই। ফলে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়মিত ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যাচ্ছে, যা একে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলেছে।

চলতি বছরের চতুর্থ দাবদাহের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনের বাসিন্দাদের ক্ষোভ এখন চরমে। পাঁচ বছর ধরে এখানে বসবাস করা অরেলি মোহামেদ (Aurélie Mohamed) জানান, তীব্র গরমে একটু শীতলতার খোঁজে তাকে ঘরের মেঝেতে ঘুমাতে হয়েছে। ১৫ বছর ধরে বসবাসকারী নাতালি রুশুস (Nathalie Rouchouse) জানান, তিনি গরমে টিকতে না পেরে বারান্দায় ঘুমান। আরেক বাসিন্দা শান্তাল হসপিটাল (Chantal Hospital) ২৬ বছর ধরে এখানে আছেন। তার খালাতো বোন ছিলেন এই ভবনের শুরুর দিকের অন্যতম বাসিন্দা। শৈশবের স্মৃতিচারণ করে শান্তাল বলেন, “নয় বছর বয়সে যখন এখানে আসতাম, তখন এই ভবন দেখে আমরা বিস্মিত হতাম। ফিরমিনির মানুষ হিসেবে আমরা এটি নিয়ে গর্ব করতাম। কিন্তু এখন আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি। আমি আর কখনো কোনো ঐতিহাসিক স্মারকে বাস করতে চাই না।”

ল্যুনিত দে হাবিতাসিওঁ ভবনে কোনো সাটার (shutters) নেই। কিন্তু ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভের কঠোর নিয়মের কারণে চাইলেই এখানে সাটার লাগানো সম্ভব নয়। ভবনের সম্মুখভাগে যেকোনো পরিবর্তনের জন্য ‘আর্কিটেক্টস অব বিল্ডিংস অব ফ্রান্স’ (ABF)-এর অনুমতির প্রয়োজন হয়। ফলে বাসিন্দারা তীব্র রোদ থেকে বাঁচতে জানালাগুলোতে কম্বল বা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ঝুলিয়ে রাখার মতো অস্থায়ী উপায় বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ফ্ল্যাটের মালিকেরা সংস্কার কাজের জন্য ৪০ শতাংশ সরকারি অনুদান ও কর ছাড় পেলেও, সামাজিক আবাসনের ভাড়াটেরা পড়েছেন চরম বিপাকে। এই অংশটি পরিচালনা করে ‘হাবিতাত এ মেট্রোপোল’ (Habitat et Métropole) নামক একটি সামাজিক আবাসন সংস্থা, যারা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এই পরিস্থিতি ফ্রান্সে এক ধরনের শ্রেণী বৈষম্যকেও ফুটিয়ে তুলেছে। ল্যুনিত দে হাবিতাসিওঁ দেখতে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার পর্যটক আসেন। এখানকার প্রদর্শনী ফ্ল্যাট ও বন্ধ হয়ে যাওয়া কিন্ডারগার্টেনটি ঘুরে দেখতে পর্যটকরা টিকিট কাটলেও, সেই আয়ের কোনো অংশই ভবনের সংস্কার বা বাসিন্দাদের সুবিধার্থে ব্যয় হয় না। ‘সাইট ল্য করবুসিয়ের’-এর প্রধান কিউরেটর জেরাল্ডিন ডাব্রিজন (Géraldine Dabrigeon) জানান, টিকিট বিক্রির অর্থ কেবল গাইডদের বেতন, বিজ্ঞাপন এবং বীমার খরচ মেটাতেই শেষ হয়ে যায়। পর্যটকরা যখন টাকা দিয়ে এই জীবন্ত জাদুঘর দেখতে আসেন, তখন বাসিন্দারা সাটার না থাকায় জানালার পাশে কম্বল ঝুলিয়ে গরমে ছটফট করেন—যা দেখতে অনেকটা চিড়িয়াখানার মতো মনে হয়। অবশ্য ল্য করবুসিয়েরের বিখ্যাত ‘পিলতি’ (pilotis) বা স্তম্ভের ওপর ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকায় এর নিচ দিয়ে বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা রয়েছে, যা অন্যান্য ত্রুটিপূর্ণ ভবনের চেয়ে কিছুটা ভালো।

সম্প্রতি দাবদাহের প্রতিক্রিয়া হিসেবে গত ৭ জুলাই ফ্রান্স সরকার একটি নতুন প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। এর অধীনে ঐতিহাসিক ভবনগুলোতে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্থানীয় কাউন্সিলগুলোকে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে, যেখানে ABF-এর মতামত কেবল পরামর্শমূলক হিসেবে গণ্য হবে। তবে রক্ষণশীল সংবাদপত্র ‘ল্য ফিগারো’ (Le Figaro) এর সমালোচনা করে বলেছে, এর ফলে ফ্রান্স তার প্রাণ হারিয়ে কেবল কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হবে। কিন্তু এই ভবনের বাসিন্দারা ইতিমধ্যেই সাটারহীন এক কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি। এ বিষয়ে শান্তাল হসপিটাল প্রশ্ন তোলেন, “একটা সময়ে এসে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতেই হবে—এই ভবনটি কি ল্য করবুসিয়েরের পরিকল্পনা অনুযায়ী আবাসিক ভবন হিসেবেই থাকবে, নাকি এটি কেবল একটি জাদুঘরে পরিণত হবে?”

ল্য করবুসিয়ের ফাউন্ডেশন কেবল এই বছরই তাদের বিভিন্ন স্থাপনায় দাবদাহের প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। তারা স্থপতির পুরোনো নকশাগুলো খতিয়ে দেখছে যাতে ঐতিহাসিক অবয়ব অক্ষুণ্ণ রেখে সাটার লাগানো যায় কিনা তা নির্ধারণ করা যায়। তবে বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ফরাসি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এই প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ হতে পারে যে ততদিনে ভবনটি সম্পূর্ণ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। ২০৫০ সালের মধ্যে ফ্রান্সে দাবদাহের প্রকোপ পাঁচ গুণ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জলবায়ু সংকটের জন্য ধনীরা মূলত দায়ী হলেও, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা সাটারহীন সামাজিক আবাসনে থাকা দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরাই সবার আগে এর চরম মূল্য দিচ্ছে।

শিরোনাম :
সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক প্রতিরক্ষা চুক্তি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়: আঙ্কারা লাল বাড়িতে সারজিস আলমের স্লোগান, কণ্ঠ মেলালেন জামায়াত নেতারা জলবায়ু সংকট ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সোচ্চার মালদ্বীপের তরুণরা বিয়ে ছাড়াই সাবেক বাগদত্তার ৫০ মিলিয়ন ডলার দাবি, হতবাক ডিজে একাডেমিকস কেয়ারিকে ১ ভোটে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার অ্যালান বোর্ডার মেডেল জিতলেন ট্র্যাভিস হেড ইতালির যুব দলগুলোর কোচিং প্যানেল ঘোষণা, অনূর্ধ্ব-২১ দলের দায়িত্বে বালদিনি ৫ বছরের শিশুকে আড়াই হাজার ডলারে বিক্রি করেন মা, খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছে আলাবামা ফ্রান্সে ল্য করবুসিয়েরের বিখ্যাত সামাজিক আবাসন এখন বাসিন্দাদের জন্য উত্তপ্ত নরক বাগদত্তার গ্রেফতার: ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে অনুতপ্ত টেক্সাসের ব্যবসায়ী ইউরোপীয় টি-টোয়েন্টি লিগে আমস্টারডাম ফ্লেমসে যোগ দিলেন অজিঙ্ক রাহানে সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক প্রতিরক্ষা চুক্তি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়: আঙ্কারা লাল বাড়িতে সারজিস আলমের স্লোগান, কণ্ঠ মেলালেন জামায়াত নেতারা জলবায়ু সংকট ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সোচ্চার মালদ্বীপের তরুণরা বিয়ে ছাড়াই সাবেক বাগদত্তার ৫০ মিলিয়ন ডলার দাবি, হতবাক ডিজে একাডেমিকস কেয়ারিকে ১ ভোটে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার অ্যালান বোর্ডার মেডেল জিতলেন ট্র্যাভিস হেড ইতালির যুব দলগুলোর কোচিং প্যানেল ঘোষণা, অনূর্ধ্ব-২১ দলের দায়িত্বে বালদিনি ৫ বছরের শিশুকে আড়াই হাজার ডলারে বিক্রি করেন মা, খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছে আলাবামা ফ্রান্সে ল্য করবুসিয়েরের বিখ্যাত সামাজিক আবাসন এখন বাসিন্দাদের জন্য উত্তপ্ত নরক বাগদত্তার গ্রেফতার: ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে অনুতপ্ত টেক্সাসের ব্যবসায়ী ইউরোপীয় টি-টোয়েন্টি লিগে আমস্টারডাম ফ্লেমসে যোগ দিলেন অজিঙ্ক রাহানে