গাজায় চলমান যুদ্ধ ও অমানবিক জীবনযাত্রার কারণে গর্ভবতী ফিলিস্তিনি নারীদের মধ্যে গর্ভপাতের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি থেকে জুন) ৩,৯৫৮টি গর্ভপাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এই সময়ে প্রতি ১,০০০ জীবিত শিশু জন্মের বিপরীতে গর্ভপাতের হার দাঁড়িয়েছে ২০৮.৫টিতে, যা ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধের (প্রতি হাজারে ৬৪টি) তুলনায় ৩.৩ গুণ বেশি।
তীব্র গরম, পুষ্টিহীনতা, বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া এবং চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার কারণে গর্ভবতী মায়েরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সাত মাসের গর্ভবতী হাদিল আল-মাদানি জানান, তাঁবুর ভেতরের জীবন অত্যন্ত কষ্টদায়ক। পানি আনা, কাপড় ধোয়া এবং রান্নার মতো দৈনন্দিন কাজগুলো করতে তাকে প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়। তীব্র গরম এবং ইঁদুর ও পোকামাকড়ের উপদ্ববের কারণে তিনি তার অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্য ও বিকলাঙ্গতা নিয়ে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকেন।
একইভাবে ৯ মাসের গর্ভবতী দোয়া আল-নাজ্জার জানান, প্লাস্টিকের তৈরি তাঁবুর অতিরিক্ত গরমে তার শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। সন্তানের জন্মের সময় ঘনিয়ে এলেও তার কাছে নবজাতকের জন্য কোনো কাপড়, ডায়াপার, দুধ বা বিছানা নেই। মাটিতে ঘুমানোর কারণে ইঁদুর ও পোকামাকড় তার শিশুর ক্ষতি করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কায় আছেন।
গাজা শহরের পশ্চিমে আল-নাসর এলাকায় অবস্থিত আল-হেলু ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান ইয়াদ আবু হোসাইরা জানান, যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। গর্ভবতী নারীদের পানি বহনের মতো ভারী কাজ করতে হচ্ছে, যা গর্ভস্থ শিশুর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া) দেখা দিচ্ছে। সরকারি তথ্যমতে, ২০২৫ সালে নিবন্ধিত গর্ভবতী নারীদের ৫৭.১ শতাংশই রক্তশূন্যতায় ভুগছিলেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ গর্ভপাতের হার রেকর্ড করা হয় (প্রতি হাজারে ৩৭৭.২৫টি) এবং জুন মাসে সর্বোচ্চ ৭৯০টি গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৭৩.৬ শতাংশ গর্ভপাত ঘটেছে গর্ভাবস্থার ১৩ সপ্তাহের আগে এবং ২৬.৪ শতাংশ ঘটেছে ১৩ থেকে ২৪ সপ্তাহের মধ্যে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়েছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত যুদ্ধের আগের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর মাত্র ৪৪ শতাংশ সচল ছিল। বর্তমানে কোনো হাসপাতালই পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না এবং অর্ধেকেরও বেশি জরুরি ওষুধ ফুরিয়ে গেছে।

