বিশ্বজুড়ে পানির সম্পদ নিয়ে উদ্বেগজনক খবর এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি পুয়ের্তো রিকোতে তীব্র খরার কারণে হাজার হাজার মানুষের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপের রাইন ও পো নদীর পানি রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে কলোরাডো নদীর পানি বণ্টন নিয়ে সাতটি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে বিরোধ চলছে এবং এর প্রধান জলাধারগুলো নির্মাণের পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
হাঙ্গেরির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দানিউব নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এছাড়া ইংল্যান্ডের সব জলাশয়ে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে পানি শোধনাগারগুলোতে বোমা হামলা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে পৌর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সাইবার হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে খরা, বন্যা বা পানির অভাব জলবায়ুর স্বাভাবিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। এটি মূলত মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে দ্রুত পরিবর্তনশীল জলবায়ু এবং দশকের পর দশক ধরে পানির অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠানে অবহেলা এবং কম বিনিয়োগের প্রত্যক্ষ পরিণতি। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করেছিলেন যে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো ও অন্যান্য মানবিক কর্মকাণ্ডের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে এবং চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করারই মাসুল দিচ্ছে বিশ্ব।
রাজনৈতিক পর্যায়েও সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। ট্রাম্প প্রশাসনের ইপিএ (EPA) নতুন পানি দূষণকারী উপাদান নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা থামিয়ে দিয়েছে এবং আগের প্রশাসনের করা নিয়মগুলো শিথিল করেছে। এছাড়া ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন, ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে এবং এনওএএ (NOAA)-এর মতো সংস্থাগুলোর বাজেটে বড় ধরনের কাঁচি চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। জনমত জরিপে দেখা যায়, মানুষ পানির পরিমাণ ও গুণগত মান নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার জন্য নতুন কোনো প্রযুক্তির উদ্ভাবন প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও নীতি বাস্তবায়নে সরকারি ও করপোরেট বিনিয়োগের অভাবই মূল সমস্যা। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কূটনীতির মাধ্যমে অভিন্ন জলাধার নিয়ে সংঘাত কমানো সম্ভব, যেমনটা ফিনল্যান্ডের পানি কূটনীতি উদ্যোগের লক্ষ্য।
পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, উন্নত বর্জ্য পানি শোধনাগার এবং দক্ষ সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে পানির ওপর চাপ কমানো যেতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানি বাদ দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত বিস্তার জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ধীর করবে এবং জ্বালানি উৎপাদনে পানির চাহিদাও কমাবে। রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিপক্ষীয় ঐকমত্য এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। পিটার গ্লিক 'দ্য থ্রি এজেস অফ ওয়াটার' (২০২৩) এবং 'হোয়েন দ্য ওয়েল ইজ ড্রাই: হাউ ওয়াটার ফুয়েলস ভায়োলেন্স অ্যান্ড শেপস পিস' (২০২৬) বই দুটির লেখক।

