যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইরানের নেতৃত্ব কৌশলগতভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকার চেষ্টা করছে। তারা অটল থেকে এটা প্রমাণ করতে চায় যে, আমেরিকা ও তাদের মিত্রদের তুলনায় ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বেশি সক্ষম। তবে এই যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি বা 'এন্ডগেম' কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে দেশটির শীর্ষ মহলে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
এই বিভাজনের এক প্রান্তে রয়েছে 'পায়দারি' বা স্থায়িত্বপন্থী অতি-কট্টরপন্থা গোষ্ঠী। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো ধরনের আলোচনার ঘোর বিরোধী এবং পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের দাবি জানিয়ে আসছে। এই গোষ্ঠীর আদর্শ হলো ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। আল্ট্রা-হার্ডলাইনার এই গোষ্ঠীটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল 'আইআরআইবি' (IRIB) এবং নিয়মিত সমাবেশের মাধ্যমে তাদের মতাদর্শ প্রচার করছে। তারা জনগণকে বোঝাতে চাইছে যে ইরান চূড়ান্ত বিজয়ের পথে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আপোষকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
অন্যদিকে, সংস্কারপন্থী শিবির বা প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সমর্থকরা যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের যুক্তি হলো, যুদ্ধের সময় অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখতে হলে জনগণের অর্থনৈতিক দুর্দশা, মুদ্রাস্ফীতি এবং উচ্চ বেকারত্বের মতো সমস্যাগুলো সমাধান করা জরুরি। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি চূড়ান্ত চুক্তি হলে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে এবং কোটি কোটি ডলারের সম্পদ ফেরত আসবে, যা দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারে।
এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে চলে এসেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ৩০ জুন ক্যালিবাফের সাথে আলোচনার একটি সরাসরি সম্প্রচার মাঝপথে কেটে দেয়। এছাড়া চলতি মাসের শুরুর দিকে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের একটি বক্তৃতাও ব্যবসায়ীদের সামনে দেওয়ার সময় মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যখন তিনি বলেছিলেন যে প্রয়াত খামেনি তার মৃত্যুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পুনরায় আলোচনার অনুমতি দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের কার্যালয় থেকে সরকারিভাবে এই সেন্সরশিপের নিন্দা জানানো হয়েছে, যা স্পষ্টতই এক ধরনের ক্ষমতার লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেয়।
জনপ্রতিনিধি এবং ধর্মীয় নেতাদের মধ্যেও যুদ্ধের বিরুদ্ধে কিছুটা অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। জুলাই মাসে প্রায় ২৫০ জন সাবেক আইনপ্রণেতা, অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি একটি যুদ্ধবিরোধী পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন। তারা মনে করেন, অধিকাংশ ইরানি শান্তি ও স্বাভাবিক জীবন চায়। এছাড়া প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের ছেলে ইউসেফ পেজেশকিয়ানও সামরিক লক্ষ্যের সাথে দুর্বল অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।
জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ভালি নাসরের মতে, যদিও জালালির সমর্থকরা সংখ্যায় কম, কিন্তু আমলাতন্ত্র এবং বিপ্লবী গার্ডের সাথে তাদের শক্তিশালী যোগাযোগ ও প্রভাব রয়েছে। এদিকে, নতুন সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি কার পক্ষে অবস্থান নেবেন, তা এখনো অস্পষ্ট। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুর দিকে তার বাবার মৃত্যুর কারণ হওয়া হামলায় তিনি নিজেও আহত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এখন উভয় পক্ষই তার সমর্থন পাওয়ার দাবি করছে। সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ আলী আবতাহির মতে, সুপ্রিম লিডার চাইলে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণের 'ব্রেক' হিসেবে কাজ করতে পারেন, তবে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

