ইসরায়েলে আগামী মঙ্গলবারের সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক ময়দানে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব মেরুকরণ। গত তিন দশক ধরে দেশটির রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রাখা প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবার তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন। গত ৩০ বছরের মধ্যে ১৯ বছরই ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে একজোট হয়েছে বিভিন্ন বিরোধী পক্ষ। জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহু সমর্থক ও বিরোধী—এই দুই শিবিরের মধ্যে লড়াই হতে যাচ্ছে একেবারেই সমানে সমান।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিরোধী শিবিরের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেসের (আইডিএফ) সাবেক চিফ অব স্টাফ গাদি আইজেনকোট। কর্মজীবী মরক্কান ইহুদি পরিবারে জন্ম নেওয়া আইজেনকোট চার বছর আগে রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। তেল আবিব ও জেরুজালেমের মাঝামাঝি শহর মোদিইনে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় তার দলের নাম 'ইশার' (যার অর্থ সোজা বা প্রত্যক্ষ) উল্লেখ করে নেতানিয়াহুর চতুর রাজনৈতিক কৌশলের বিপরীত অবস্থানের কথা তুলে ধরা হয়। সেখানে আইজেনকোট “মিথ্যামুক্ত দেশ”, “দায়িত্বশীলতা ও দৃষ্টান্তমূলক নেতৃত্ব” এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা নির্ধারণের আহ্বান জানান।
সমাবেশে আসা সমর্থকদের বক্তব্যেও উঠে আসে নেতানিয়াহু-বিরোধী মনোভাব। ৫৬ বছর বয়সী নোয়া সাদাহ জানান, নেতানিয়াহুর মতো শুধু মিষ্টি কথা বলা নেতাদের বিষয়ে তারা বিরক্ত এবং এখন কাজের মানুষকে দরকার। আইজেনকোটের অধীনে কাজ করা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ডেভিড নাদলার (৭৪) তার সততার ওপর জোর দেন। অপরদিকে, ২০২২ সালে নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়া ওদেদ লেভি জানান, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের বিপর্যয়ের দায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। সম্প্রতি নেতানিয়াহুর অনুরাগী চ্যানেল ১৪-এর উপস্থাপক ইনন মাগাল আইজেনকোটকে নিয়ে একটি কটু মন্তব্যে মরক্কান “বানর” বলে আখ্যা দেন। আইজেনকোট শালীনতা বজায় রেখে এই মন্তব্যের কোনো জবাব না দিলেও, নেতানিয়াহু নিজে এই বর্ণবাদী আচরণের নিন্দা জানাননি।
বর্তমান নির্বাচনটি ঐতিহ্যগত বাম ও ডানপন্থী ভাবধারার চেয়ে মূলত 'বিবি' (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) এবং 'বিবি-বিরোধী' জোটে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিরোধী শিবিরে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং মলদোভায় জন্ম নেওয়া অ্যাভিগডোর লিবারম্যানের মতো ব্যক্তিত্বরা, যারা মূলত জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং একসময় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী থাকলেও পরে তার চরম বিরোধী হয়ে ওঠেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে নেতানিয়াহুর এখনো ক্ষমতায় টিকে থাকার সম্ভাবনা বিস্ময়কর ঠেকলেও ইসরায়েলের অভ্যন্তরে তার বিগত দিনের পারফরম্যান্স নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। তার শাসনামলেই ঘটেছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা, যার স্মৃতি এখনো দেশজুড়ে বাসস্ট্যান্ড ও প্ল্যাটফর্মে ঝুলে থাকা নিহতদের ছবির মাধ্যমে জীবন্ত। এছাড়া গাজায় নির্বিচার হামলায় ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়া (যার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ হামাস যোদ্ধা বলে ইসরায়েলের দাবি) এবং পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে মারাত্মক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন হামাসকে ধ্বংস করার এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূল করার, যার কোনোটিই সফল হয়নি। পাশাপাশি ৭ অক্টোবরের আগে বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করার বিতর্কিত চেষ্টা, সাহায্য পাওয়ার বিনিময়ে কাতারকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের 'কাতারগেট' কেলেঙ্কারি এবং তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি মামলা সত্ত্বেও তিনি লড়াইয়ে টিকে আছেন।
নেতানিয়াহুর এই শক্ত অবস্থানের মূলে রয়েছে গত তিন দশক ধরে গড়ে ওঠা তার অনুগত ভোটব্যাংক। ৭ অক্টোবরের গোয়েন্দা সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার রিপোর্ট সামনে এলেও তার সমর্থকেরা অটল রয়েছে। তার সমর্থক সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন নেটওয়ার্ক থেকে প্রচার করা হচ্ছে যে, ওই ব্যর্থতার জন্য সেনা ও গোয়েন্দা প্রধানেরা দায়ী, নেতানিয়াহু নন। এছাড়া নির্বাচনী অঙ্ক ও জোট গঠনের রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর সুনিপুণ দক্ষতা তাকে ১২০ আসনবিশিষ্ট নেসেটে সরকার গঠনে বাড়তি সুবিধা দেয়।
তবে বিরোধীরাও আশাবাদী। বিদেশে অবস্থানরত হাজার হাজার উদারপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলি মঙ্গলবার ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশে ফিরছেন, যা জনমত জরিপে সরাসরি ধরা না পড়লেও নেসেটের একক কোনো আসনের ব্যবধানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে জেরুজালেমে ১৯৯৫ সালে নিহত শান্তিকামী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইতজাক রাবিনের স্মরণে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু অনুপস্থিত ছিলেন এবং কেবল একজন জুনিয়র মন্ত্রীকে পাঠান।
রাবিনের দল 'দ্য ডেমোক্র্যাটস'-এর বর্তমান নেতা এবং ৭ অক্টোবরের উদ্ধারকাজের অন্যতম ব্যক্তিত্ব সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলান নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য একটি আঞ্চলিক কৌশলগত প্রক্রিয়া শুরু করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। যদিও ২০০৫ সালে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘটনার পর 'শান্তি' শব্দটি অনেক ইসরায়েলির কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে, তবুও সম্প্রতি নেগেভ মরুভূমির এক সংগীত উৎসবে তরুণদের রাবিনের সেই ঐতিহাসিক গান 'শির লাশালোম' (শান্তির গান) গেয়ে নাচতে দেখা গেছে। এই দৃশ্য বহু ইসরায়েলিকে আশা জোগাচ্ছে যে নেতানিয়াহু যুগের হয়তো অবসান ঘটতে চলেছে।

