বর্তমান ফ্যাশন ও জীবনযাত্রায় পরিপাটি রূপের দিন যেন ফুরিয়ে আসছে। স্টেসি সলোমন বা শান্ত বিলাসিতার (quiet luxury) যুগ পেছনে ফেলে আবার ফিরে আসছে অগোছালো বা 'মেসি' রূপ। তবে ঘরদোর এবং পোশাক-আশাকে যারা চিরকালই কিছুটা অগোছালো, তাদের জন্য এটি আনন্দের খবর হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—সমাজ কি আসলেই মানুষের বাস্তব জীবনের অগোছালো রূপটিকে মেনে নিতে প্রস্তুত? ফ্যাশন সাময়িকী 'এল' (Elle)-এর চলতি সংখ্যার একটি নিবন্ধে সুজি লাউ লিখেছেন, অগোছালো ভাবকে এখন নান্দনিকভাবে উদযাপন করা হচ্ছে। যেমন প্রাদার নোংরা শার্টের কাফ ও সুতো ছেঁড়া এমব্রয়ডারি, শ্যানেলের জীর্ণ হ্যান্ডব্যাগ কিংবা ডিজেলের 'এক্সট্রিম-ট্রিটেড ডেনিম' পোশাকের মাধ্যমে এই ট্রেন্ডের প্রকাশ ঘটছে।
এই অগোছালো ভাব কেবল ফ্যাশন রানওয়েতেই সীমাবদ্ধ নেই। জীবনযাত্রার অন্যান্য ক্ষেত্রেও এটি জায়গা করে নিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে 'গবলিন মোড' (goblin mode), বিছানায় অলস সময় কাটানো বা 'বেড রটিং' (bed rotting) এবং ইন্সটাগ্রামে ঝাপসা ও এলোমেলো ছবির পোস্ট এখন বেশ জনপ্রিয়। এমনকি তরুণ প্রজন্মের (জেন জি) মধ্যে অ্যালকোহল পানের প্রবণতাও বাড়ছে। একটি পানীয় শিল্প গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যেখানে ৬৬ শতাংশ জেন জি তরুণ পানীয় গ্রহণ করত, ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৭৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ধূমপানও যেন ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে, যা কাইলি জেনার, দুয়া লিপা ও হেইলি বিবারের মতো তারকাদের হাতে শোভা পাচ্ছে।
নিজের জামাকাপড় সবসময় কুঁচকে থাকা এবং ঘরে উপচে পড়া আবর্জনার মধ্যে বাস করা লেখক এমা বেডিংটন এই ট্রেন্ড দেখে খুশি হতে পারতেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মসৃণ নান্দনিকতা এবং সবকিছুর অতি-পরিপাটি করার যে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা, তার বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন, ফ্যাশনের এই অগোছালো রূপ আর বাস্তব জীবনের অগোছালো অবস্থার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। সুন্দর করে সাজানো এলোমেলো টেবিল, নান্দনিকভাবে ছড়ানো ভাঙা বাসনকোসন কিংবা নিভে যাওয়া সিগারেটের টুকরোকে ফ্যাশনেবল মনে করা হলেও, বাস্তব জীবনের আসল সমস্যাগুলো এখনো সমাজের কাছে ব্রাত্য। অর্থনৈতিক সংকট, মানসিক যন্ত্রণা, অসুস্থতা কিংবা বিষণ্ণতার কারণে থালাবাসন ধুতে না পারা বা গোসল করতে না পারার মতো বাস্তব পরিস্থিতিগুলোকে সমাজ এখনো নোংরা ও অগ্রহণযোগ্য চোখেই দেখে।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'দ্য কাট'-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে ক্যাথরিন জেজার-মরটন উল্লেখ করেছেন যে, নিজের জীবনের কঠিন সংগ্রাম বা ব্যর্থতা প্রকাশ করা সামাজিক মাধ্যমে এখনো একটি বড় ট্যাবু। তিনি লিখেছেন, মানুষের প্রতিদিনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা মানসিক টানাপোড়েন প্রকাশের কোনো সহজ পথ নেই। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, অসুস্থতা বা আর্থিক সংকটের মতো যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলো সামাজিক মাধ্যমে তখনই শেয়ার করা হয়, যখন মানুষ তা কাটিয়ে ওঠে। অথবা সেগুলোকে কর্পোরেট কায়দায় একটি সফল উত্তরণের গল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। জেজার-মরটনের মতে, নড়বড়ে অর্থনীতির এই সময়ে মানুষ সামাজিক মাধ্যমে নিজের একটি সফল ও পরিপাটি ব্র্যান্ড ইমেজ বজায় রাখতে বাধ্য হয়। এছাড়া মেটা-র মতো টেক জায়ান্টদের নজরদারি এবং ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার আশঙ্কায় মানুষ সামাজিক মাধ্যমকে নিরাপদ মনে করে না।
টিকটক বা সাবস্ট্যাকের মতো মাধ্যমের কিছু অন্ধকার কোণে হয়তো ক্রনিক অসুস্থতা বা আর্থিক কষ্টে থাকা মানুষের আসল যন্ত্রণার চিত্র পাওয়া যায়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে এই অগোছালো ফ্যাশন ট্রেন্ডটি বাজারে বিক্রি হওয়া আগে থেকেই ছিঁড়ে রাখা ডেনিম জিন্সের মতোই কৃত্রিম। ইন্টারনেটের শুরুর যুগে মানুষ অবলীলায় নিজেদের জীবনের আসল রূপ প্রকাশ করত, কিন্তু লেখক নিজেও এখন সেই পথ থেকে সরে এসে পোষা প্রাণী বা গাছের ছবি পোস্ট করেন। তিনি মনে করেন, ফ্যাশন যেকোনো কিছুকেই আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে—যেমন ১৮৫ পাউন্ড মূল্যের ডিএইচএল ইউনিফর্ম টি-শার্ট কিংবা জাপানিজ পরীক্ষামূলক পোশাক, যা পরিধানকারীকে দেখতে ময়লার ব্যাগে আটকে থাকা মাকড়সার মতো লাগে। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, ট্রেন্ডসেটাররা যদি সাধারণ মানুষের নোংরা ও এলোমেলো জীবনকে ফ্যাশনেবল করে তোলে, তবে খুব দ্রুতই তারা আবার এটিকে সেকেলে বা অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করবে।

