২০২৩-২৪ মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে ইতালিয়ান ক্লাব এএস রোমা থেকে নিজের বিদায় নিয়ে দীর্ঘ মুখ খুলেছেন হোসে মরিনহো। পর্তুগিজ এই স্পেশাল ওয়ানের দাবি, ২০২৩ সালের ইউরোপা লিগের ফাইনালে হারের পরই রোমায় তার ক্যারিয়ার মূলত ‘শেষ’ হয়ে গিয়েছিল। একই সাথে ফাইনালের পর Request-এর পরদিন হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট বিমানবন্দরে ম্যাচ রেফারি অ্যান্থনি টেইলর এবং তার পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ রোমা সমর্থকদের চড়াও হওয়ার ঘটনার কোনো দায় নিজের নয় বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার রাতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে স্তাদিও অলিম্পিকোতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মরিনহো। এর আগে ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যম ‘কোরিয়েরে দেল্লো স্পোর্ত’-এর সাংবাদিক ইভান জাজ্জারোনিকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে রোমায় কাটানো সময় নিয়ে কথা বলেন তিনি।
রোমার ডাগআউটে নিজের কাটানো সময়কে অত্যন্ত ভালোবাসার সাথে স্মরণ করেন মরিনহো। তার অধীনেই ক্লাবটি দীর্ঘ ১৪ বছরের ট্রফির খরা কাটিয়ে ২০২১-২২ মৌসুমে প্রথমবারের মতো কনফারেন্স লিগের শিরোপা জিতেছিল। এরপর ২০২২-২৩ মৌসুমে রোমাকে ইউরোপা লিগের ফাইনালে নিয়ে যান তিনি। তবে অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে সেভিয়ার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় ইতালিয়ান ক্লাবটির।
সেই ফাইনাল ম্যাচটি ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল ম্যাচ শেষে কারপার্কে রেফারি অ্যান্থনি টেইলরের প্রতি মরিনহোর ক্ষোভ উগরে দেওয়ার ঘটনা। সে সময় রেফারির সিদ্ধান্তকে ‘লজ্জাজনক’ বলে কড়া সমালোচনা করেছিলেন তিনি। এর পরদিনই বুদাপেস্ট বিমানবন্দর দিয়ে ফেরার পথে ক্ষুব্ধ রোমা সমর্থকদের তোপের মুখে পড়েন রেফারি টেইলর ও তার পরিবার। এমনকি কিছু সমর্থক তাদের দিকে চেয়ারও ছুঁড়ে মেরেছিলেন।
মরিনহো মনে করেন, সেদিনই রোমায় তার অধ্যায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবে বিমানবন্দরের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায় নিতে নারাজ তিনি। সাক্ষাৎকারে মরিনহো বলেন, “রোমার বিরুদ্ধে বলার মতো কোনো খারাপ শব্দ আমার কাছে নেই, ক্লাবের মালিকপক্ষের বিরুদ্ধেও আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি থিয়াগো পিন্টোর বিষয়ে একটি নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলাম, যার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থনাও করেছি। আমি যখন কোনো ক্লাব ছাড়ি, তখন সম্পর্কগুলো সুন্দর রেখেই বিদায় নিতে পছন্দ করি। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ক্লাবের ভেতরে আমি অত্যন্ত ভদ্র একজন মানুষ। আমি রোমা থেকে ভালোভাবে বিদায় নিয়েছি এবং মনে করি এই ক্লাবটি সবসময় আমার নিজের ঘরের মতোই থাকবে।”
রিয়াল মাদ্রিদে ফেরা প্রসঙ্গে মরিনহো বলেন, “রিয়াল মাদ্রিদে ফেরাও যেন নিজের ঘরে ফেরার মতো। আমি সেখানে তিন বছর ছিলাম, কিন্তু মনে হয় যেন ৩০ বছর কাটিয়েছি। কারণ সেটি ছিল অত্যন্ত বিশেষ একটি সময়।”
রোমা সমর্থকদের সাথে নিজের বিশেষ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে মরিনহো বলেন, “তারা আমার সাথে অসাধারণ আচরণ করেছিলেন। আমার মনে আছে, প্রথম দিন যখন মালপেনসা বিমানবন্দরে পৌঁছালাম, সেখানে প্রায় এক হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। আমি ভাবছিলাম, আমি তো এখনো কিছুই করিনি, কোনো ম্যাচও খেলিনি, তাদের জন্য একটি পয়েন্টও এনে দিইনি। বিষয়টি আমাকে বেশ স্পর্শ করেছিল। রোমার সমর্থকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে আমি নিজের ইমেজ, ক্লাবের মালিকানা বা ইতালিয়ান ফুটবলের রাজনীতি কিংবা সংবাদমাধ্যমের সাথে সম্পর্ক নিয়ে মাথা ঘামাইনি। আমার কাছে কেবল রোমা এবং তাদের সমর্থকরাই শেষ কথা ছিল। আমি তাদের জন্য লড়াই করেছি এবং নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছি। আমরা এমন একটি ট্রফি জিতেছি, যা হয়তো নিয়মিত জেতা দলগুলোর কাছে খুব সামান্য, কিন্তু রোমার মতো দলের জন্য এটি অনেক বড় অর্জন। সম্প্রতি আমার এক বন্ধু ট্রিগোরিয়াতে (রোমার অনুশীলন মাঠ) গিয়ে আমাকে একটি ছবি পাঠিয়েছিল। সেখানে প্রবেশদ্বারে এখনো সেই একটি ট্রফিই শোভা পাচ্ছে।”
ইউরোপা লিগ ফাইনাল এবং রেফারি টেইলরকে গালিগালাজ করার ঘটনা প্রসঙ্গে মরিনহো বলেন, “বুদাপেস্টের ফাইনালটি ছিল সমর্থকদের সাথে আমার সম্পর্কের সর্বোচ্চ শিখর। ফাইনাল শেষে আমরা ছুটিতে যাই এবং যখন ফিরে আসি, ততক্ষণে আমি মৃত। উয়েফার চোখে আমি শেষ হয়ে গিয়েছিলাম এবং যে ঘটনার জন্য আমি দায়ী ছিলাম না, তার সাজা আমাকে ভোগ করতে হয়েছে। বিমানবন্দরে যা ঘটেছিল তার দায় আমার ছিল না। কারপার্কে রেফারিকে গালি দেওয়ার দায় আমার ছিল এবং তার জন্য শাস্তি আমার পাওনা ছিল। কিন্তু বিমানবন্দরের ঘটনার জন্য আমার সাজা পাওয়া উচিত ছিল না। তবুও আমাকে তার মূল্য চোকাতে হয়েছে। এটি মালিকপক্ষের সাথে আমার সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়, কারণ ফাইনালের পর তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমার চেয়ে আলাদা ছিল। আমি ফিরে আসার পর থেকেই মৃত ছিলাম এবং কয়েক মাস পর আমাকে বরখাস্ত করা হয়।”
২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রোমার দায়িত্বে থাকলেও মরিনহোর বিশ্বাস, ফাইনালের দিনই তার চাকরি চলে গিয়েছিল। তিনি আরও যোগ করেন, “আমি কখনোই ফ্রিডকিনদের (রোমার মালিকপক্ষ) সাথে আমার সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করিনি। আমি যদি এখন রোমায় ফিরে করিডোরে তাদের সাথে দেখা পাই, তবে কোনো সমস্যা ছাড়াই তাদের হ্যালো বলব। কিন্তু আমার মনে হয়, ফাইনালের দিনই আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।”

