ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনী প্রচারণায় নামছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দেশটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী, যিনি একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন এবং আদালতে নিজের ফৌজদারি মামলার বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছেন। ২০১৯ সালে অভিযুক্ত হওয়ার পর ২০২০ সাল থেকে তাঁর এই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমানে তিনি তিনটি ভিন্ন মামলায় জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ এবং সবচেয়ে গুরুতর একটি মামলায় ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলা এই দুর্নীতি মামলার মূল ভিত্তি হলো ১০০০, ২০০০ এবং ৪০০০ নম্বর কেস। ১০০০ নম্বর কেসে অভিযোগ করা হয়েছে যে, নেতানিয়াহু ও তাঁর পরিবার ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চুরুট ও শ্যাম্পেনের মতো মূল্যবান উপহার নিয়েছেন এবং বিনিময়ে তাঁদের ব্যবসায়িক সুবিধা পাইয়ে দিতে হস্তক্ষেপ করেছেন। ২০০০ নম্বর কেসটি মূলত দৈনিক ‘ইয়েদিওথ আহরোনথ’-এর প্রকাশক আরনন মোজেসের সঙ্গে নেতানিয়াহুর রেকর্ডকৃত কথোপকথন সংক্রান্ত। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিযোগী পত্রিকা ‘ইসরায়েল হায়োম’-কে দুর্বল করার বিনিময়ে নেতানিয়াহুর পক্ষে ইতিবাচক সংবাদ প্রচারের বিষয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল।
তবে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি রয়েছে ৪০০০ নম্বর কেসে। এখানে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি ‘বেজেক’-কে নীতিগত সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে তাদের তৎকালীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের ‘ওয়ালা’ নিউজ ওয়েবসাইটে নিজের অনুকূলে সংবাদ প্রচারের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। নেতানিয়াহু অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করে একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তবে ঘুষের অভিযোগটি নিয়ে প্রসিকিউশন কিছুটা জটিলতায় পড়েছে। গত জুনে বিচারকরা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে এই অভিযোগটি প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে এবং তারা এটি প্রত্যাহারের পরামর্শ দেন। তবে প্রসিকিউটররা এই অভিযোগ প্রত্যাহার করলেও বাকি মামলাগুলোতে জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিচার চলতে থাকবে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নেতানিয়াহু আদালতে নিজের সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন। তাঁর সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও পরবর্তী প্রশ্নোত্তর পর্ব ১৮ মাস ধরে মোট ৯৮টি শুনানিতে গড়ায়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি বারবার তাঁর বিদেশ সফর, শারীরিক অসুস্থতা এবং কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণ দেখিয়ে স্থগিত বা বাতিলের আবেদনের কারণে বিঘ্নিত হয়েছে। গত ২৪ জুন তিনি তাঁর জবানবন্দি শেষ করলেও বিচারপ্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে, কারণ আরও বেশ কয়েকজন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া বাকি।
এরই মধ্যে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে নেতানিয়াহু নিজের অপরাধ স্বীকার না করেই প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে ক্ষমার আবেদন জানান। তবে ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট হারজগ জানান, এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আইনি প্রক্রিয়াগুলো পুরোপুরি শেষ হওয়া প্রয়োজন। ইসরায়েলের ইতিহাসে ফৌজদারি বিচার শেষ হওয়ার আগে কাউকে ক্ষমা করার কোনো নজির নেই। তবে ইসরায়েলি আইন অনুযায়ী, বিচার চলাকালীনও নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকতে পারছেন, যার ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ফৌজদারি বিচার সমান্তরালভাবে চলছে।
নেতানিয়াহুর পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী সারা নেতানিয়াহুও আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছেন। ২০১৯ সালে সরকারি তহবিল অপব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের জন্য ১ লাখ ডলারেরও বেশি মূল্যের খাবার অর্ডার করার অভিযোগে একটি দোষ স্বীকারের চুক্তির (plea bargain) মাধ্যমে তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগটি কমিয়ে আনা হয় এবং তিনি রাষ্ট্রকে ৪৫,০০০ শেকেল ফেরত দিতে এবং ১০,০০০ শেকেল জরিমানা দিতে সম্মত হন।
তবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি ১০০০ নম্বর কেসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হাদাস ক্লেইনকে হুমকি দেওয়ার এবং স্বামীর বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেছেন। একটি টেলিভিশন প্রতিবেদনের সূত্র ধরে এই তদন্ত শুরু হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি। সারা ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উভয়েই তাঁদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নেতানিয়াহুর এই আইনি সংকট কেবল ইসরায়েলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আইসিসির বিচারকরা জানান, গাজায় যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য নেতানিয়াহু দায়ী বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে অনাহারকে ব্যবহার করা, হত্যা, নিপীড়ন এবং অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। ইসরায়েল অবশ্য আইসিসির এই এখতিয়ারকে অস্বীকার করেছে এবং নেতানিয়াহু সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এদিকে, আঞ্চলিক সামরিক সংঘাতের মধ্যেই নির্বাচনী প্রচারণার হাওয়া বইছে। গত ১৮ আগস্ট উত্তর সিরিয়ার আবু আল-দুহুর সামরিক বিমান ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। নেতানিয়াহুর কার্যালয় দাবি করে, তুরস্ক ওই ঘাঁটিতে সামরিক সরঞ্জাম সরাতে পারে—এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে তুরস্ক এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে জানায়, সেখানে তাদের কোনো সামরিক উপস্থিতি ছিল না। এমনকি সিরিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক জানান, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইসরায়েলের দাবিটি খতিয়ে দেখে তা মিথ্যা পেয়েছে। তিনি এই হামলাকে একটি ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি’ বলে অভিহিত করেন।
সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানিও জানান যে, সেখানে তুরস্কের কোনো স্থায়ী ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা নেই। এই ঘটনার পর সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপকে ‘বেপরোয়া ও বোকা’ বলে সমালোচনা করেন। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার গোলান এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালন অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থে সামরিক সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করছেন। নেতানিয়াহু এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি যেখানে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আইনি লড়াইয়ের ভাগ্য নির্বাচনী ফলাফলের ওপর সরাসরি নির্ভর করছে না, বরং সমান্তরালভাবে দুটি ভিন্ন ক্ষেত্রে তা নির্ধারিত হচ্ছে।

