নিউজিল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র তিন মাস আগে নাটকীয় রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে নিজের নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন। বুধবার ওয়েলিংটনে দলের এক গোপন বৈঠকে লাক্সনের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন তারই প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস পেঙ্ক। তবে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ভোটাভুটিতে জয়ী হন লাক্সন। পরাজয়ের পর ক্রিস পেঙ্ককে মন্ত্রিত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি অবসর নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
আগামী ৭ নভেম্বর নিউজিল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে লাক্সনের নেতৃত্ব নিয়ে এটি ছিল দ্বিতীয় আস্থা ভোট। এর আগে গত এপ্রিলেও তাকে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বুধবারের আস্থা ভোটে জয়ের পর দলের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন লাক্সন। তবে তিনি সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। লাক্সন বলেন, "আজ সকালে আমাদের ককাস বৈঠকে আমার নেতৃত্বের ওপর একটি আস্থা ভোট হয়েছে। ককাসের পূর্ণ সমর্থন আমার প্রতি রয়েছে এবং আমাদের দল ঐক্যবদ্ধ ও নির্বাচনে জয়ী হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।" তবে এই গোপন ব্যালটে কতজন আইনপ্রণেতা তার পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তা প্রকাশ করেননি তিনি।
ভোটের কয়েক ঘণ্টা পর এক বিবৃতিতে লাক্সন জানান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস পেঙ্ক তার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এবং এ কারণে তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৪৭ বছর বয়সী পেঙ্ক প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ভবন ও নির্মাণ, নিরাপত্তা সংস্থা এবং মহাকাশ বিষয়ক দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন। পরে লাক্সনের কার্যালয় থেকে পেঙ্কের একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়, যেখানে তিনি জানান যে তিনি আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেবেন না এবং সংসদ থেকে পদত্যাগ করবেন। অস্ট্রেলীয় নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও সাবেক আইনজীবী পেঙ্ক ২০১৭ সালে প্রথম সংসদে প্রবেশ করেন। বিবৃতিতে তিনি লাক্সনের সমালোচনা না করে বলেন, "পরিবারের সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার পর আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মন্ত্রী হিসেবে আমি যে অবদান রেখেছি তার জন্য আমি গর্বিত, তবে নিউজিল্যান্ডের সেবা করার জন্য অন্য সুযোগ খোঁজার এখনই উপযুক্ত সময়।"
সম্প্রতি লাক্সনের কিছু মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড দলের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল, যা এই নেতৃত্ব সংকটের জন্ম দেয়। চলতি মাসের শুরুতে এক ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে লাক্সন মন্তব্য করেন যে, দেশের কিছু ব্যবসায়ী নেতার মধ্যে 'বাবা-সন্তান' মানসিকতা রয়েছে এবং তারা সবকিছুর জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মন্তব্যকে বাস্তবতাবিবর্জিত বলে সমালোচনা করেন তার নিজের দলের সদস্যরাও। পরবর্তীতে এই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চান লাক্সন। এছাড়া, একটি দলীয় তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার জন্য সামরিক বিমান ব্যবহার করার তথ্য ফাঁসের পর তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন। একই সঙ্গে, ককাসকে না জানিয়ে পুনরায় নির্বাচিত হলে নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে গণভোট করার আকস্মিক প্রতিশ্রুতি দিয়েও দলের আইনপ্রণেতাদের চমকে দেন তিনি।
লাক্সন ২০২০ সালে প্রথম সংসদে প্রবেশ করেন এবং ২০২১ সাল থেকে মধ্য-ডানপন্থী ন্যাশনাল পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর আগে তিনি একটি এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী ছিলেন। ২০২৩ সালের নির্বাচনের পর থেকে তার দল একটি ডানপন্থী জোট সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা ক্রিস হিপকিন্স। তিনি বলেন, "পেছন থেকে ছুরিকাঘাত এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিউজিল্যান্ডের জন্য কেবল বিলম্ব ও বিভ্রান্তিই ডেকে আনবে। ন্যাশনাল পার্টি যদি নিজেদেরই শাসন করতে না পারে, তবে নিউজিল্যান্ডের মানুষ কীভাবে তাদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেবে?" এর আগে মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাক্সন নিজেই তার নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষের কথা প্রকাশ করে বুধবারের বৈঠক ডেকেছিলেন। এক্স-এ (সাবেক টুইটার) তিনি লিখেছিলেন, "নির্বাচনের মাত্র ৯০ দিন আগে এই বিভেদ ও অনৈক্য একটি বড় বিভ্রান্তি। যখন এত কিছু বাজি রেখে লড়াই চলছে, তখন নিউজিল্যান্ডের জনগণ এবং ন্যাশনাল পার্টির একনিষ্ঠ প্রার্থী ও সমর্থকদের জন্য এই বিভ্রান্তি অন্যায়।"

