অনলাইন ডেটিং অ্যাপের জগতে এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় 'সোয়াইপ' বা ডানে-বামে টেনে জোড়ি খোঁজার মডেলটি এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। ব্যবহারকারীদের মধ্যে 'সোয়াইপ ক্লান্তি' (সোয়াইপ ফ্যাটিগ) বাড়তে থাকায় বাম্বল, টিন্ডার ও গ্রাইন্ডারের মতো শীর্ষস্থানীয় অ্যাপগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে এবং ব্যবসায়িক মন্দা কাটিয়ে উঠতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে তাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিচ্ছে। প্রায় ১০ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের এই বিশ্বব্যাপী ডেটিং শিল্প এখন পুরোপুরি এআই-নির্ভর হয়ে ওঠার দৌড়ে শামিল হয়েছে।
২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা ডেটিং অ্যাপ বাম্বল নারীদের ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নিয়ম ছিল, ম্যাচ হওয়ার পর প্রথম বার্তাটি নারীকেই পাঠাতে হবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই নিয়মে পরিবর্তন এসেছে। সম্প্রতি তারা 'ওপেনিং মুভস' ফিচারের মাধ্যমে এই নিয়ম শিথিল করেছে এবং এখন তাদের মূল বৈশিষ্ট্য 'সোয়াইপ' পদ্ধতিটিই পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রযুক্তি ও সম্পর্কের নৈতিকতা বিষয়ক গবেষক দার্শনিক লুক ব্রানিং এই অবস্থাকে বাম্বলের জন্য একটি 'উদ্ধার অভিযান' বা 'স্যালভেজ মোড' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, রাজস্ব কমে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বাম্বল ইতিমধ্যে তাদের কর্মী ছাঁটাই ও পুনর্গঠন করেছে। এখন টিকে থাকার জন্য তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবর্তনের পথ বেছে নিয়েছে।
এই সংকটের মুখে শুধু বাম্বলই নয়, পুরো ডেটিং অ্যাপ শিল্পই এখন এআই-এর দিকে ঝুঁকছে। যেমন, গ্রাইন্ডার নিজেকে একটি 'এআই-ফার্স্ট' প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করছে। টিন্ডার পরীক্ষা করছে 'কেমিস্ট্রি' নামক একটি এআই-চালিত সিস্টেম, যা ব্যবহারকারীদের সোয়াইপ করার ক্লান্তি কমাবে। অন্যদিকে বাম্বল তৈরি করছে 'বি' (Bee) নামের একটি এআই ম্যাচমেকিং অ্যাসিস্ট্যান্ট। এমনকি লন্ডনের স্টার্টআপ 'ফেইট' (Fate) সোয়াইপ করার ঝামেলাই রাখেনি। এই 'এজেন্টিক এআই ডেটিং অ্যাপ'-এ ব্যবহারকারীদের সাথে একটি এআই চ্যাটবট ইন্টারভিউ নেয় এবং তাদের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে উপযুক্ত সঙ্গী খুঁজে দেয়।
তবে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে এআই-এর এই প্রবেশকে সবাই ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না। প্রযুক্তি ও অন্তরঙ্গতা বিষয়ক গবেষক অ্যাডাম পিকক মনে করেন, ডেটিং অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীদের মূল আপত্তিটি বুঝতে ভুল করছে। তিনি বলেন, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে এআই-এর প্রবেশ নিয়ে একটি সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে জেনারেশন জেড (জেন জি) সন্দেহ করছে যে, এই অ্যাপগুলো আসলে ভালো সম্পর্ক তৈরি করার জন্য নয়, বরং ব্যবহারকারীদের ধরে রেখে অর্থ উপার্জনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। ডেটিং অ্যাপগুলো মানুষের একাকীত্ব থেকে মুনাফা লুটছে এবং ব্যক্তিগত তথ্য যেমন—বাসস্থান, চেহারা, পছন্দ ও আচরণকে বিশাল ডেটায় পরিণত করছে। পিকক মনে করেন, এই অ্যাপগুলো ভবিষ্যতে ডেটিং অ্যাপের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা লাইফস্টাইল পণ্যে রূপ নিতে পারে। জেন্ডার ও সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক এলসা কুগেলবার্গ মনে করেন, অনলাইন ডেটিং আধুনিক জীবনের সাথে এতটাই মিশে গেছে যে এটি হয়তো পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না, তবে প্রোফাইল ঘেঁটে সোয়াইপ ও মেসেজ পাঠানোর প্রথম প্রজন্মের ডেটিং অ্যাপের যুগ হয়তো শেষ হতে চলেছে।
গবেষক লুক ব্রানিং অবশ্য মনে করেন, ডেটিং অ্যাপের মান উন্নত করতে সবসময় এআই-এর ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার না করেও ভালো মডারেশন বা তদারকি, স্পষ্ট নীতিমালা, প্রোফাইল উপস্থাপনের উন্নত পদ্ধতি এবং ব্যবহারকারীদের জন্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাড়ানোর মাধ্যমে অনলাইন ডেটিংয়ের অভিজ্ঞতা আরও সুন্দর করা সম্ভব। তার মতে, জনপ্রিয়তা হারানো কোনো পণ্যের ওপর কেবল এআই-এর প্রলেপ লাগিয়ে দিলেই সেটি কার্যকর পণ্য হয়ে ওঠে না।

