ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস উপকূলে শনিবার ভোরে ৭.৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সময় সকাল ৫টা ৫৮ মিনিটে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে অন্তত ২০ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি ও ভবন ধসে পড়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল পূর্ব নুসা টেঙ্গারা প্রদেশের এন্ডে শহর থেকে ৬৮ কিলোমিটার (৪২ মাইল) উত্তর-উত্তরপশ্চিমে এবং এর গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার। প্রাথমিক কম্পনের পর বেশ কয়েকটি আফটারশকও অনুভূত হয়েছে।
মাউমেরে সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ এজেন্সির প্রধান ফাতুর রহমান জানিয়েছেন, সিকা, পশ্চিম ম্যাঙ্গরাই এবং পূর্ব ম্যাঙ্গরাই—এই তিনটি বিধ্বস্ত রিজেন্সিতে উদ্ধারকর্মীরা অন্তত ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। এর মধ্যে রিয়োক গ্রামের একটি ভূমিধসের ঘটনায় আটজনের মরদেহ পাওয়া গেছে। এছাড়া ভূমিধসে নিখোঁজ হওয়া আরও দুই গ্রামবাসীকে উদ্ধারে তল্লাশি চলছে। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ভূমিধসে পাহাড় থেকে মাটি ধসে পড়ায় এই উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। গুরুতর আহত ছয়জনকে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর উপকূলীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে সুনামির সতর্কতা জারি করে এবং বাসিন্দাদের উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। তবে ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতি বিষয়ক সংস্থা পরে জানায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হওয়ায় সুনামির কোনো হুমকি নেই এবং সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।
পূর্ব নুসা টেঙ্গারা পুলিশ প্রধান রুদি দারমোকো জানিয়েছেন, শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে ভবনগুলো ধসে পড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা তথ্য আদান-প্রদান এবং ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। এন্ডে অঞ্চলে ভূমিধসের কারণে ফ্লোরেস দ্বীপের প্রধান সংযোগ সড়ক ট্রান্স-ফ্লোরেস হাইওয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাহাড়ি সড়কটি লাবুয়ান বাজো থেকে লারান্তুকা পর্যন্ত বিস্তৃত।
স্থানীয় টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গেছে, ভূমিকম্পের পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে হাসপাতাল থেকে রোগীদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের কর্মীরা বিছানা, আইভি স্ট্যান্ড এবং অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাইরে নিয়ে এসে জরুরি চিকিৎসার জন্য অস্থায়ী কেন্দ্র স্থাপন করেছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা লজিস্টিক সহায়তা এবং জরুরি উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য একটি হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে। দ্বীপবেষ্টিত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই আকাশপথের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া নাগেকিও রিজেন্সির প্রায় ২,০০০ গ্রামবাসী ঘরবাড়ি ছেড়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছেন।
ফ্লোরেস দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্পের তীব্রতা অনুভূত হয়েছে। সিকা রিজেন্সির বাসিন্দা ইয়োহানা এমবু জানান, শক্তিশালী কম্পনে অনেক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আতঙ্কিত মানুষ উঁচু স্থানের দিকে ছুটে গেছে। তিনি আরও বলেন, মাউমেরে বন্দরের যাত্রী টার্মিনালের ওয়েটিং রুম ধসে পড়েছে। রিতাপিরেত সেমিনারির রেক্টর ফাদার গুইডেলবার্তাস টাঙ্গা জানান, সকালে প্রার্থনা চলাকালীন অ্যাসেম্বলি হলের ছাদ ধসে পড়লে শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এ সময় এক যাজক ছাদ থেকে লাফ দিতে গিয়ে পা ভেঙে আহত হয়েছেন।
ভূমিকম্পের ফলে লাবুয়ান বাজো এবং বিমা শহরেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ, যা প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অফ ফায়ার'-এ অবস্থিত। এর আগেও ১৯৯২ সালে ফ্লোরেস দ্বীপে এক শক্তিশালী ভূমিকম্প ও সুনামিতে প্রায় ২,৫০০ জন নিহত হয়েছিল। এছাড়া ২০১৮ সালে পালুতে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামিতে ৪,৪০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারায় এবং ২০১০ সালে মেন্তাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে ভূমিকম্প ও সুনামিতে ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে সুমাত্রার উপকূলে ৯.১ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামিতে ১২টি দেশে ২,৩০,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।

