দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের একটি আদালত বুধবার রায় দিয়েছে যে, ২০২০ সালে দুই দেশের মধ্যে স্থাপিত যৌথ লিয়াজোঁ অফিস ধ্বংসের দায়ে উত্তর কোরিয়াকে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৪৪.৬ বিলিয়ন ওন বা প্রায় ৩২.৫ মিলিয়ন ডলার প্রদান করতে হবে। পিয়ংইয়ং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনার ব্যর্থতার পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে এই লিয়াজোঁ অফিসটি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তবে সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের এই রায়টি মূলত প্রতীকী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে এই অর্থ আদায়ের কোনো কার্যকর উপায় দক্ষিণ কোরিয়ার হাতে নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সব ধরনের অর্থবহ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত রেখেছেন। এমনকি তিনি দক্ষিণ কোরিয়াকে তার সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করছেন, যাকে তিনি নতুন 'শীতল যুদ্ধ' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এর আগে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে মামলা করা হলেও, কোনো লিয়াজোঁ অফিস ধ্বংসের ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের পক্ষ থেকে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘটনা এটিই প্রথম। ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়া এই মামলা দায়ের করে। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, উত্তর কোরিয়ার সীমান্তবর্তী শহর কিয়েসংয়ে ভবনটি উড়িয়ে দেওয়া ছিল একটি বেআইনি ও সহিংস কাজ, যা দেশ দুটির মধ্যকার পূর্বের চুক্তি লঙ্ঘন করেছে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
২০২০ সালের জুন মাসে উত্তর কোরিয়া বিস্ফোরক ব্যবহার করে কিয়েসংয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মিত লিয়াজোঁ অফিসটি ধ্বংস করে। এর আগে উত্তর কোরিয়া অভিযোগ করেছিল যে, সিউল উত্তর কোরিয়ার দলত্যাগকারীদের বেলুনের মাধ্যমে পিয়ংইয়ংবিরোধী প্রচারপত্র পাঠানো বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালের জানুয়ারিতেই ভবনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং বিস্ফোরণের সময় এটি খালি ছিল।
সেই সময় ভবন ধ্বংসের ঘটনাটিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনার অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে সিউলের ওপর চাপ প্রয়োগের একটি হিসাবকৃত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছিল। সাবেক উদারপন্থী প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন ২০১৮ সালে কিম জং উনের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেছিলেন এবং কিমের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম সম্মেলনের আয়োজনে সহায়তা করেছিলেন। তবে ২০১৯ সালে কিম-ট্রাম্প দ্বিতীয় সম্মেলনের পর সেই কূটনীতি থমকে যায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতার আংশিক সমর্পণের বিনিময়ে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত করেছেন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধে সহায়তার জন্য হাজার হাজার সৈন্য ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পাঠিয়েছেন।
একই দিনে সিউলের আদালত সীমান্ত এলাকা থেকে উত্তর কোরিয়ার দিকে ড্রোন পাঠানোর দায়ে তিন ব্যক্তিকে জেল ও স্থগিত কারাদণ্ড দিয়েছে। আদালত রায় দিয়েছে যে, তারা দক্ষিণ কোরিয়ার আকাশপথ নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘন করেছে। এই ড্রোন ওড়ানোর ঘটনা উত্তর কোরিয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল, যারা একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর 'জঘন্য হস্তক্ষেপ' বলে সতর্ক করেছিল।

