ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত বর্তমানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত পাঁচটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেখানে নিয়মিত হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা এই আঞ্চলিক যুদ্ধ কেবল ইরান সরকারের পতনের লক্ষ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
কিছুদিন শান্ত থাকার পর পেন্টাগন পুনরায় ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতি রাতেই হামলা চালাচ্ছে এবং তেহরানও এই অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা জবাব দিচ্ছে। সংঘাতটি সৌদি আরব, ইরাক, ইয়েমেন, জর্ডান এবং মিশরেও বিস্তৃত হয়েছে। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, বিমান হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি সামরিক বাহিনী ইরাকি সরকারের সাথে সমন্বয় করেছে, তবে ইরাকি নেতারা তাৎক্ষণিকভাবে এই দাবি অস্বীকার করেছেন। এই অস্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, অনেক আঞ্চলিক নেতা ট্রাম্পের এই বিস্তৃত যুদ্ধের অংশ হতে চান না। ইরাকের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যও এই হামলার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে, কারণ দেশটি মার্কিন-ইরান যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করতে এবং উভয় পক্ষের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর সাদ্দাম হোসেনের পতনের মাধ্যমে শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে, যা ইরাকে ইরানের প্রভাব বিস্তারের পথ প্রশস্ত করে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেমানি এই প্রভাব বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের নির্দেশে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় সোলেমানি ও পিএমএফ কোয়ালিশনের উপপ্রধান আবু মাহদি আল-মুহান্দিস নিহত হন, যা বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব এখন এই যুদ্ধকে আরও বিপজ্জনক দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরব ইয়েমেনের হুথি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে। ফেব্রুয়ারির শেষে ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, যার মাধ্যমে প্রতিদিন বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়। এর ফলে সৌদি আরবসহ তেল উৎপাদনকারীরা তাদের রপ্তানি লোহিত সাগরের দিকে সরিয়ে নেয়। তবে হুথিরা লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম, যেমনটি তারা ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর করেছিল।
২০ জুলাই হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজগুলোর ওপর অবরোধ ঘোষণা করে। এরপর ২৫ জুলাই তারা সৌদি আরবের ইয়ানবু রপ্তানি কেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব ইয়েমেনে হুথি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা শুরু করেছে। এই সংঘাতের ফলে সৌদি আরবের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিও ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

