দীর্ঘ ২৮৬ দিন সমুদ্রে কাটানোর পর থাইল্যান্ডের লেম চাবং বন্দরে নোঙর করেছে মার্কিন নৌবাহিনীর পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন শেষে গত ২ সেপ্টেম্বর রণতরীটি থাইল্যান্ডে পৌঁছায়। তবে দীর্ঘ এই সমুদ্রযাত্রার মধ্যে জাহাজে থাকা ক্রুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয় এবং জীবনযাত্রার মান অবনতির নানা খবর সামনে এসেছে।
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক যুগে টানা সবচেয়ে বেশি দিন সমুদ্রে থাকার রেকর্ড গড়েছে এই রণতরীটি। ইরানের সাথে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মার্কিন নৌ-অবরোধ ও সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া এই রণতরীতে প্রায় ৫,০০০ নৌসেনা ও মেরিন সেনা রয়েছেন। থাইল্যান্ডের কর্মকর্তাদের মতে, মার্কিন সেনাদের বিশ্রাম ও রসদ সংগ্রহের জন্য রণতরীটি সেখানে পাঁচ দিন অবস্থান করবে।
সাধারণত মার্কিন নৌবাহিনীর রণতরীগুলো ছয় থেকে নয় মাসের জন্য মোতায়েন করা হয়, তবে যুদ্ধাবস্থায় এই মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে। গত বছরের নভেম্বরে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মোতায়েন করা হয়েছিল। ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ৩-এর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল রবার্ট ই. লাফরান এক বিবৃতিতে বলেন, "লেম চাবংয়ে আমাদের আগমন আমাদের নৌসেনা ও মেরিনদের বিশ্রাম ও নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের একটি উপযুক্ত সুযোগ করে দিয়েছে। এই স্ট্রাইক গ্রুপ যা অর্জন করেছে তা সত্যিই ঐতিহাসিক। আমাদের অভিযান চলাকালীন দলের প্রতিটি সদস্য যে অসাধারণ পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা দেখিয়েছেন, তার জন্য আমি অত্যন্ত গর্বিত।"
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই সফরের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি কেবল দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী রসদ সংগ্রহ এবং বিশ্রামের একটি অংশ। ১৯৫৪ সালে থাইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিভিত্তিক মিত্র দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ২০০৩ সালে একে প্রধান নন-ন্যাটো (non-NATO) মিত্রের মর্যাদা দেওয়া হয়। আব্রাহাম লিংকনের সাথে গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই. পিটারসেন জুনিয়র’-ও এসেছে, যা প্রায় ৬.২ মাইল দূরে শ্রী রাচায় নোঙর করেছে। দীর্ঘ যাত্রার কারণে দুটি যুদ্ধজাহাজের গায়েই মরিচা ও পানির লাইনে ক্ষয়ে যাওয়া রঙের দাগ স্পষ্ট দেখা গেছে।
হাজার হাজার মার্কিন সেনার আগমনে থাইল্যান্ডের বিখ্যাত পর্যটন শহর পাতায়ার অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার আশা করা হচ্ছে, যদিও শহরটির যৌন পর্যটনের কুখ্যাতিও রয়েছে। পাতায়ার মেয়র পোরামাসে এনগামপিচেস জানান, সেনাদের বন্দর থেকে পাতায়ায় আনা-নেওয়ার জন্য প্রায় ৪০টি বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সেনাদের জন্য কিছু নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। রয়টার্সকে মেয়র বলেন, "সেনাদের ওয়াটার স্পোর্টস, জেট স্কিইং, বাঞ্জি জাম্পিং, কুস্তি এবং বক্সিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কার্যকলাপে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।"
পাতায়ার সমুদ্র সৈকত ও নাইটলাইফ এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। গত সপ্তাহান্তেই এক অভিযানে পতিতাবৃত্তির সন্দেহে ৪০ থেকে ৫০ জনকে আটক করা হয়। থাইল্যান্ডে পতিতাবৃত্তি অবৈধ হলেও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে এটি প্রকাশ্যে চলে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মার্কিন সেনাদের আগমনে বেশ উচ্ছ্বসিত। পাতায়ার বিখ্যাত ‘ওয়াকিং স্ট্রিট’ এলাকার ৪৩ বছর বয়সী পোশাক বিক্রেতা কাদসালিন কেতপা সেনাদের জন্য বাস্কেটবল ভেস্ট এবং হাতি-ছাপের প্যান্টের স্টক বাড়িয়েছেন। তিনি বলেন, "বেশ কিছুদিন ধরে ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে। আশা করছি ওদের আগমনে বিক্রি বাড়বে।" ৪৫ বছর বয়সী খাবার বিক্রেতা সারোচ বলেন, মার্কিন সেনাদের আগমন ব্যবসার জন্য দারুণ খবর। তিনি বলেন, "ওরা এখানে আসে মদ্যপান করতে, আনন্দ করতে এবং নিজেদের মেলে ধরতে।"

