চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে পুরোনো পরামর্শগুলোর একটি হলো—পর্যাপ্ত ঘুমানো, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং সুষম খাবার খাওয়া। সচরাচর আমরা এগুলোকে আলাদা অভ্যাস হিসেবে দেখলেও, স্নায়ুবিজ্ঞানের (neuroscience) সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন এই তিনটি অভ্যাস আসলে আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কে একই গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে। আর এই রহস্যের মূলে রয়েছে আমাদের কোষের ভেতরে থাকা এক অতি ক্ষুদ্র অঙ্গাণু—মাইটোকন্ড্রিয়া (mitochondria)।
মস্তিষ্কের জটিল কার্যপ্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মানুষের চিন্তাভাবনা অত্যন্ত শক্তি-নিবিড় একটি প্রক্রিয়া। মানুষের মস্তিষ্ক শরীরের মোট ওজনের মাত্র ২ শতাংশ হলেও, বিশ্রামের সময় এটি শরীরের মোট শক্তির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০%) ব্যবহার করে। প্রতিটি স্মৃতি মনে করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া বা নতুন কোনো সৃজনশীল চিন্তার পেছনে একটি বিপাকীয় বা মেটাবলিক খরচ রয়েছে। সহজ কথায়, প্রতিটি চিন্তাই শরীরের বিপুল শক্তি খরচ করে।
কিন্তু এই শক্তির উৎস আসলে কোথায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রায় ২০০ কোটি বছরেরও বেশি সময় আগের এক প্রাচীন বিবর্তনীয় ইতিহাসে। তখন একটি আদিম কোষ একটি ব্যাকটেরিয়াকে গ্রাস করেছিল। তবে কোষটি ব্যাকটেরিয়াটিকে হজম না করে নিজের ভেতরে রেখে দেয় এবং তাদের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব তৈরি হয়। সময়ের ব্যবধানে সেই ব্যাকটেরিয়াটিই খাদ্যের রাসায়নিক শক্তিকে এটিপি (ATP)-তে রূপান্তর করতে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে ওঠে, যা আমাদের প্রায় প্রতিটি জৈবিক প্রক্রিয়াকে সচল রাখে। এই ব্যাকটেরিয়ার বংশধররাই হলো আজকের মাইটোকন্ড্রিয়া, যা লোহিত রক্তকণিকা ছাড়া শরীরের প্রায় সব কোষে বিদ্যমান। লোহিত রক্তকণিকা হিমোগ্লোবিনের জায়গা তৈরি করতে এবং অক্সিজেন পরিবহন উন্নত করতে মাইটোকন্ড্রিয়া দূর করে দেয়।
দীর্ঘকাল ধরে জীববিজ্ঞান বইগুলোতে মাইটোকন্ড্রিয়াকে কেবল কোষের "পাওয়ারহাউস" বা শক্তিঘর হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো, যেখানে মূল গুরুত্ব পেত নিউরন। তবে নিউরোসায়েন্টিস্ট ও ‘দ্য ২১স্ট সেঞ্চুরি ব্রেন’ (টরভা) বইয়ের লেখক হ্যানা ক্রিচলো জানান, বর্তমানে এই ধারণায় পরিবর্তন আসছে। নিউরন তখনই চিন্তা বা আবেগ তৈরি করতে পারে, যখন মাইটোকন্ড্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানিকে শক্তিতে রূপান্তর করে। মানুষের বুদ্ধিমত্তা, গাণিতিক দক্ষতা, প্রক্রিয়াকরণ গতি, কর্মক্ষম স্মৃতিশক্তি, মস্তিষ্কের সুস্থ বার্ধক্য এবং মানসিক চাপ সহনশীলতা সরাসরি সুস্থ মাইটোকন্ড্রিয়াল কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে।
এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পুরোনো স্বাস্থ্য পরামর্শগুলোকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে। যেমন, ব্যায়াম কেবল পেশি বাড়ায় না, বরং এটি মস্তিষ্কের শেখা ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত অঞ্চল 'হিপোক্যাম্পাস'-কে শক্তিশালী করে এবং মাইটোকন্ড্রিয়ার সংখ্যা ও কার্যকারিতা বাড়ায়। আবার, ঘুমের সময় আমাদের অবচেতন মস্তিষ্ক মাইটোকন্ড্রিয়াসহ অন্যান্য জীর্ণ কোষীয় উপাদান মেরামত ও প্রতিস্থাপন করে। একে মাইটোকন্ড্রিয়ার "রক্ষণাবেক্ষণ শিফট" বলা যেতে পারে। অন্যদিকে, পুষ্টিকর খাবার মাইটোকন্ড্রিয়াকে তার রাসায়নিক কাজ করার জন্য সঠিক জ্বালানি জোগায়। প্রক্রিয়াজাতহীন খাবার এই শক্তি রূপান্তরকে সহজ করে, যেখানে অতিরিক্ত বা অস্বাস্থ্যকর খাবার এই প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়।
মাইটোকন্ড্রিয়াল সাইকোবায়োলজিস্ট মার্টিন পিকার্ডের মতে, নিজেদের আণবিক মেশিন ভাবার চেয়ে একটি "শক্তির প্রক্রিয়া" হিসেবে ভাবা বেশি যুক্তিযুক্ত। মানুষের প্রতিটি চিন্তা, স্মৃতি ও অনুভূতি বিলিয়ন বিলিয়ন কোষের শক্তির রূপান্তরের ওপর নির্ভরশীল। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে সিদ্ধার্থ মুখার্জির ‘দ্য সং অব দ্য সেল’ (ভিন্টেজ, ১৪.৯৯ পাউন্ড), নিক লেনের ‘ট্রান্সফরমার: দ্য ডিপ কেমিস্ট্রি অব লাইফ অ্যান্ড ডেথ’ (প্রোফাইল, ১৪.৯৯ পাউন্ড) এবং ফিলিপ বলের ‘হাউ লাইফ ওয়ার্কস: আ ইউজার্স গাইড টু দ্য নিউ বায়োলজি’ (পিকাডর, ১৪.৯৯ পাউন্ড) বইগুলোতে। ২০০ কোটি বছর আগের সেই প্রাচীন ব্যাকটেরিয়ার অংশীদারিত্বই আজ আমাদের বেঁচে থাকা ও চিন্তাভাবনার জগতকে সচল রেখেছে।

