গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো গণহত্যার নেপথ্যে থাকা অত্যন্ত গোপন ও স্বয়ংক্রিয় সামরিক ব্যবস্থার বিবরণ উঠে এসেছে একটি নতুন তথ্যচিত্রে। ২৪ জন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তার দেওয়া বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে নির্মিত ‘নাজা’ (NAZA) নামের এই তথ্যচিত্রটি বৃহস্পতিবার ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। অস্কারজয়ী ইসরায়েলি পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি উৎসবের মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন লায়ন’ পুরস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা একমাত্র তথ্যচিত্র।
‘নাজা’ শব্দটি মূলত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত একটি সংক্ষিপ্ত রূপ (acronym), যা কোনো সামরিক হামলায় সম্ভাব্য নিহত হতে যাওয়া বেসামরিক নাগরিকদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ প্রযোজিত এই তথ্যচিত্রে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সৈন্যদের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে, যারা গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর নজরদারি এবং দূরনিয়ন্ত্রিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং সামরিক অভিযানের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ঝুঁকির কারণে তেল আবিবের বিভিন্ন ছাদে রাতের আঁধারে এই সাক্ষাৎকারগুলো ধারণ করা হয়। তথ্যচিত্রে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় গোপন রাখতে তাদের চেহারা ও কণ্ঠস্বর ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে পরিবর্তন করা হয়েছে।
তথ্যচিত্রে ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যবহৃত অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এই এআই ব্যবস্থাগুলো মূলত হামাসের নিম্ন পদের সদস্যদের চিহ্নিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের অবস্থান ট্র্যাক করতে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা তাদের মোবাইল ফোন হ্যাক করত। এমনকি হামলার ঠিক আগ মুহূর্তে তারা লক্ষ্যবস্তুর স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে কথোপকথনও আড়ি পেতে শুনত। এরপর রাতের বেলা যখন তারা বাড়িতে পরিবারের সাথে থাকত, তখনই সেখানে বোমা হামলা চালানো হতো, যদিও সামরিক বাহিনী জানত যে এর ফলে পুরো পরিবারই মারা যাবে।
এছাড়া তথ্যচিত্রে গাজার এমন কিছু এলাকায় চালানো ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ বিবরণ রয়েছে, যেখানে প্রায় ২৫ শতাংশ বেসামরিক মানুষ নিজেদের ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে ইসরায়েলি বাহিনীর ধারণা ছিল। এর পাশাপাশি পদ্ধতিগতভাবে বেসামরিক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার বিবরণও উঠে এসেছে। সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজন সেনা সদস্য সরাসরি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের অধীনে কাজ করা একটি গোপন গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। তাদের একজন জানান, তাদের মূল মিশনই ছিল "শান্তি বিনষ্ট করা"।
ভেনিসে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম বলেন, "আমরা শুধু এই কর্মকর্তাদের বলেছিলাম: ‘অনুগ্রহ করে আপনারা কী করেছিলেন তা বর্ণনা করুন। এই ব্যবস্থাগুলো কীভাবে কাজ করে? আমাদের কাছে তার একটি রূপরেখা তুলে ধরুন।’ কখনও কখনও শুধু প্রশ্ন করার মাধ্যমেই উত্তরগুলো পাওয়া গেছে। তাদের কেউ কেউ তাদের কাজের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ কেউ তা করেননি। কেউ উদাসীনতা থেকে কথা বলেছেন, আবার কেউ কেউ গর্বের সাথে।"
এক যৌথ বিবৃতিতে আব্রাহাম ও সোর বলেন, ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক হিসেবে নিজেদের অবস্থান থেকে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের গণহত্যার পেছনের পদ্ধতিগুলো খতিয়ে দেখা তারা নিজেদের দায়িত্ব মনে করেছেন। তারা জোর দিয়ে বলেন, তাদের লক্ষ্য কোনো বিচ্ছিন্ন যুদ্ধাপরাধের ওপর আলো ফেলা ছিল না; বরং মূল লক্ষ্য ছিল সামগ্রিক আদেশ, নীতি, এবং গৃহীত ব্যবস্থার পেছনের যুক্তি ও ভাষা উন্মোচন করা, যা এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে সম্ভব করে তোলে। তথ্যচিত্রটি সহ-প্রযোজনা করেছেন জেমস উইলসন এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে ছিলেন জোনাথন গ্লেজার, যারা এর আগে অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’-এ একসঙ্গে কাজ করেছিলেন।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর তথ্যচিত্রটি প্রায় ২৫ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে অভিবাদন (standing ovation) লাভ করে। বিনোদন বিষয়ক সাময়িকী ‘ভ্যারাইটি’ এটিকে ভেনিস বা যেকোনো বড় চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাসে দীর্ঘতম হাততালির রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রদর্শনীর সময় দর্শকসারির অনেকে ফিলিস্তিনি পতাকা প্রদর্শন করেন। চলচ্চিত্রটি মূলত ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম ‘প্লাস ৯৭২ ম্যাগাজিন’ (+972 Magazine), হিব্রু ভাষার আউটলেট ‘লোকাল কল’ এবং ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। গার্ডিয়ানের তদন্ত বিভাগের প্রধান এবং এই চলচ্চিত্রের অন্যতম নির্বাহী প্রযোজক পল লুইস বলেন, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দাদের ব্যবহৃত ব্যবস্থাগুলো উন্মোচন ও যাচাই করার জন্য বছরের পর বছর ধরে চালানো কঠোর পরিশ্রমের ফসল হলো ‘নাজা’। উৎসবের শৈল্পিক পরিচালক আলবার্তো বারবেরা প্রদর্শনীর আগে এটিকে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
পরিচালকদের আগের কাজ ‘নো আদার ল্যান্ড’ ২০২৫ সালে সেরা তথ্যচিত্র হিসেবে অস্কার জিতেছিল, যা তারা ফিলিস্তিনি সহ-পরিচালক বাসেল আদরা এবং হামদান বাল্লালের সাথে যৌথভাবে নির্মাণ করেছিলেন। সেই চলচ্চিত্রের সাথে তুলনা করে তারা বলেন, পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে পরিচালিত দখলদারিত্ব ও জাতিগত আধিপত্যের একটি বড় চিত্র তুলে ধরতে তারা কাজ করেছিলেন। আর ‘নাজা’ তথ্যচিত্রে তারা দুই ডজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষ্য সংগ্রহ করে এমন একটি সামরিক ব্যবস্থার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন, যাকে জাতিসংঘ কমিশন এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো "গণহত্যা" (genocide) হিসেবে অভিহিত করেছে।
২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭৩,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। এছাড়া আহত হয়েছেন ১,৭৪,০০০-এর বেশি মানুষ, যা গাজার যুদ্ধপূর্ব জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও বেশি। গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয় এবং তিন-চতুর্থাংশের বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন আকস্মিক হামলার পর ইসরায়েল এই যুদ্ধ শুরু করে, যে হামলায় ১,২০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক।

