হজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইরানে হামলা স্থগিতের আহ্বান সৌদির

পবিত্র হজের সময় ইরানের ওপর কোনো সামরিক হামলা চালালে মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ধ্বংস হয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে। এমন সতর্কবার্তা দিল সৌদি আরব। এর পরই ইরানে সম্ভাব্য নতুন হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে হজ ও ঈদুল আজহা শেষে আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে পরিস্থিতি। ইতিমধ্যে ‘রমজান যুদ্ধ’ থেকে সেরে দ্রুত সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে ইরান।

পবিত্র হজ মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সমাবেশ। প্রতি বছর লাখো মানুষ মক্কা-মদিনায় সমবেত হন। এই সময়টিতে যুদ্ধ নয়, শান্তি ও ভক্তির আবহ থাকার কথা। সৌদি আরব তাই যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—হজ চলাকালে ইরানে হামলা হবে না।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে সৌদি আরবের এমন সতর্কবার্তার পরই ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সৌদির শঙ্কা: ভাবমূর্তি সংকট ও ক্ষেপণাস্ত্রের জবাব

সৌদি কর্মকর্তারা মনে করছেন, হজের সময় ইরানে হামলা চালালে মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি ইরান পাল্টা জবাব হিসেবে সৌদি আরব বা এর প্রতিবেশী দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে হজযাত্রীদের নিরাপত্তা ও চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তাও গণমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তর থেকেও হজ মৌসুমে হামলা না চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল, এই সময়ে সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতির কারণ হতে পারে।

‘রমজান যুদ্ধ’ থেকে ইরান পুনরায় সাজছে

এর আগে চলতি বছরের রমজান মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ঘটনার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের অভ্যন্তরে ওই সংঘাতকে ‘রমজান যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এখন যুদ্ধবিরতির সুযোগে দ্রুত সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে ইরান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, তেহরান ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ করছে এবং সামরিক উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছে।

হজ শেষে আবার সংকটের আশঙ্কা

সৌদির সতর্কবার্তায় ট্রাম্প আপাতত পিছু হটলেও পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, হজ ও ঈদুল আজহা শেষ হওয়ার পর আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল-ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী টানাপড়েন দিন দিন জটিল আকার ধারণ করছে। একদিকে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা ফিরে পেতে মরিয়া, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে বদ্ধপরিকর।

হজের পবিত্রতা বনাম যুদ্ধের রাজনীতি

হজের সময়টি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের জন্য পরিচিত। যুদ্ধবিরতি বা সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার জন্য এই সময়টি ঐতিহাসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখেই যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।

পবিত্র মক্কা-মদিনার রক্ষক হিসেবে সৌদি আরবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হজযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন তাদের দায়িত্ব, তেমনি মুসলিম বিশ্বের অনুভূতির প্রতিও তাদের সজাগ থাকতে হয়। সে কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন এই সতর্কবার্তাকে আমলে নিয়েছে।

তবে ভবিষ্যতে কী হয়—সেটাই এখন দেখার বিষয়। হজ শেষে ট্রাম্প কি ইরানের বিরুদ্ধে আবার কঠোর অবস্থানে ফিরবেন, নাকি কূটনৈতিক পথে সমাধানের চেষ্টা করবেন? আর ইরানের পুনরায় সামরিক সক্ষমতা অর্জন কি নতুন করে যুদ্ধের আগুন জ্বালাবে? উত্তর মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনীতির উপর ছেড়ে দিয়েছে ইতিহাস।

Related posts

Leave a Comment