থাইল্যান্ডে ভয়াবহ আগুনে বাংলাদেশি প্রবাসীর স্বপ্ন পুড়ে ছাই, ক্ষতি ৮০ লাখ টাকা

থাইল্যান্ডের পর্যটন নগরী পটায়ার ১৩ নম্বর গলিতে বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর টেইলর শপ ও রেস্টুরেন্ট সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। দীর্ঘ ১৮ বছরের পরিশ্রম ও প্রায় ৮০ লাখ টাকার বিনিয়োগ মুহূর্তে ছাই হয়ে যাওয়ায় ভেঙে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী মোয়াজ্জেম হোসেন।

থাইল্যান্ডের পর্যটন ও বিনোদনের রাজধানী পটায়া। প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত এই শহরের ১৩ নম্বর গলির দোকানগুলো যেন বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু গত ২১ মে দিবাগত রাত সাড়ে ৩টায় সেই গলিতেই নেমে আসে বিপর্যয়। বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে। আগুন গ্রাস করে পাশাপাশি দুটি দোকান—একটি টেইলর শপ, অন্যটি রেস্টুরেন্ট। দুটোর মালিক এক ব্যক্তি: বরিশাল সদরের মোয়াজ্জেম হোসেন।

প্রায় ১৮ বছর ধরে থাইল্যান্ডে ব্যবসা করা মোয়াজ্জেম ২০০৭ সাল থেকে পটায়ায় টেইলর শপ চালিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি নতুন স্বপ্নে বুক বেঁধে পাশের দোকানটিতে শুরু করেছিলেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। কিন্তু আগুন সেদিন কোনো স্বপ্ন দেখেনি। পুড়িয়ে দিয়েছে আসবাবপত্র, গার্মেন্টস মেশিনারি, দোকানের কাপড়ের স্টক, রেস্টুরেন্টের সরঞ্জাম—সবকিছু। ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ২০ লাখ বাথ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় কমপক্ষে ৮০ লাখ টাকা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে। ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। ততক্ষণে অবশ্য দোকানদুটির সবটুকুই পুড়ে ছাই। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন আশপাশের ব্যবসায়ীরা। তবে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।

‘এক রাতেই সব শেষ’

ভগ্ন প্রায় কণ্ঠে মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘জীবনের সব পরিশ্রম এই দুইটা দোকানের পেছনে দিয়েছিলাম। পরিবার-স্বজন, ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ—সব স্বপ্ন বুনেছিলাম এগুলো ঘিরে। এক রাতেই সব ছাই। এখন কীভাবে আবার শুরু করব, বুঝতে পারছি না।’

প্রবাস জীবনের টানাপড়েন আর সঞ্চয়ের টাকা ঢেলে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান হঠাৎ হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। তাঁর বাড়ি বরিশাল সদরে। দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রবাস জীবনে এমন বিপর্যয় আর কখনো দেখেননি।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশে দাঁড়ানোর ডাক

পটায়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ঘটনাটি ব্যাপক শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মোয়াজ্জেম হোসেনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কেউ কেউ আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন, কেউবা নৈতিক সমর্থন জানিয়েছেন। থাইল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি।

বাংলাদেশি প্রবাসীরা থাইল্যান্ডের পর্যটন শিল্পে ছোট-বড় নানা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাঁদের অনেকেই টেইলরিং, রেস্তোরাঁ, জুয়েলারি কিংবা পর্যটনসেবামূলক কাজ করেন। হঠাৎ এ ধরনের দুর্যোগে তাঁদের অনেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, কারণ অধিকাংশ ব্যবসাই বীমার আওতার বাইরে থাকে।

ক্ষতি শুধু অর্থের নয়

প্রায় ৮০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি মোয়াজ্জেমের জন্য শুধু অর্থনৈতিক সুরত না, এটি তাঁর গোটা সংসারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। প্রবাসী একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর পক্ষে এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের মতো দেশে বিদেশি হিসেবে নতুন করে ব্যবসা শুরু করতে গেলে বাধা আসে নানা নিয়মকানুন, পুঁজি ও অনিশ্চয়তা।

প্রবাসী ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি দূতাবাসের সহায়তা জরুরি হয়ে পড়ে। আইনি জটিলতা থেকে শুরু করে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের পথ বের করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

এখন প্রশ্ন হলো—মুহূর্তের বিপর্যয়ে স্বপ্নভাঙা মোয়াজ্জেম হোসেনের পাশে কে দাঁড়াবে? শুধু প্রবাসীরা নয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দূতাবাসের ভূমিকাও এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রবাসে একজন বাংলাদেশির এই পতন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, এর ছায়া পড়ে পুরো কমিউনিটির ওপর। যাঁরা পরিশ্রম আর সাহস দিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেন, তাঁদের বিপদে এগিয়ে আসাই রাষ্ট্র ও সমাজের কর্তব্য।

Related posts

Leave a Comment