ফ্রান্সের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ‘ভূঁইফোড়’ সংগঠনের জাল

(Images generated by AI)

প্যারিসে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তার বাড়ছে। ব্যবসা, চাকরি, সংস্কৃতি—সবক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার সঙ্গেই যেন বাড়ছে এক অস্বস্তি। নামমাত্র গঠনতন্ত্র, কোনো সামাজিক কাজ ছাড়াই শুধু পদ-পদবির লোভে গড়ে উঠছে অসংখ্য ‘ভূঁইফোড়’ সংগঠন। সম্প্রতি অনুমতি ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে সম্মাননা প্রদানকে কেন্দ্র করে তুমুল বিতর্ক ছড়িয়েছে। একাধিক সংগঠন ও ব্যক্তি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। ফরাসি আইনে যার শাস্তি এক বছর কারাদণ্ড ও ১৫ হাজার ইউরো জরিমানা।

ফ্রান্সের প্যারিস। ইউরোপের এই শহরে এখন হাজার হাজার বাংলাদেশি। ব্যবসা-বাণিজ্য, পেশাজীবন, স্থানীয় রাজনীতি—সব জায়গায় তাদের পদচারণা। গত এক দশকে অভিবাসীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে নানা সামাজিক ও আঞ্চলিক সংগঠন। কমিউনিটির ঐক্য ও উন্নয়নের লক্ষ্যে এগুলো প্রশংসার দাবিদার।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কতগুলো সংগঠন সত্যিই কাজ করছে? আর কতগুলো শুধু নামের বিলাসবহর?

‘আগের ঐক্য এখন নষ্ট’

প্রবীণ কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আশারাফ ইসলাম ৩৭ বছর ধরে ফ্রান্সে আছেন। তিনি বলেন, ‘আগে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য ও ঐক্য ছিল। এখন বিভিন্ন ভূঁইফোড় সংগঠন সৃষ্টি হওয়ায় সেই আগের পরিবেশ অনেকটাই নষ্ট হচ্ছে।’

অভিযোগ, কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য, গঠনতন্ত্র বা সামাজিক কার্যক্রম ছাড়াই শুধু ব্যক্তিগত প্রচারণা ও পদ-পদবির লোভে গড়ে উঠছে অসংখ্য সংগঠন। এতে কমিউনিটির পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সম্মাননার নামে প্রতারণা?

সবচেয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তথাকথিত ‘অ্যাওয়ার্ড’ ও ‘সম্মাননা’ প্রদানকে ঘিরে। অভিযোগ, কিছু সংগঠন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারণা চালিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে অনুমতি ছাড়াই সম্মাননা ক্রেস্ট তৈরি ও বিতরণ করছে।

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফ্রান্স’ নামের একটি সংগঠন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংগঠনটির সভাপতি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন, এমনকি বাংলাদেশের কয়েকটি মূলধারার গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে সম্মাননা ক্রেস্ট তৈরি করেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে নিজেও সেই সম্মাননা গ্রহণ করেন। অথচ যেসব সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানকে ‘সম্মাননাদাতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাদের অনেকেই এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

যার নাম ব্যবহার, তিনি জানেন না

ডিবিসি টেলিভিশনের ফ্রান্স প্রতিনিধি ইকবাল মাহমুদ জাফর বলছেন, ‘ডিবিসি টেলিভিশন ফ্রান্সের নামে যে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে, সে বিষয়ে আমাকে বা আমার অফিসকে কিছুই জানানো হয়নি। অফিসের নির্দেশনায় ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শুধু ডিবিসি নয়, ফ্রান্স-বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (এফবিজেএ) এবং ফ্রান্স বাংলাদেশ বিজনেস ফোরামও অনুমতি ছাড়া নাম ব্যবহারের প্রতিবাদ জানিয়েছে।

ফ্রান্স বাংলাদেশ বিজনেস ফোরামের সভাপতি জুনেদ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের না জানিয়ে সংগঠনের নামে বেআইনিভাবে সম্মাননা গ্রহণ করে শুধু আমাদের সংগঠনকেই নয়, পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিকেই বিব্রত করা হয়েছে।’

ফরাসি আইন কী বলে?

ফরাসি দণ্ডবিধির ২২৬-৪-১ ধারা অনুযায়ী পরিচয় বা পরিচিতি অপব্যবহার শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অপরাধে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ১৫ হাজার ইউরো জরিমানার বিধান রয়েছে। এছাড়া বিভ্রান্তিকর বা প্রতারণামূলক উপস্থাপন প্রমাণিত হলে ভোক্তা সুরক্ষা আইনের আওতায় দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ৩ লাখ ইউরো জরিমানা হতে পারে।

‘প্রকৃত সম্মান কাজের মাধ্যমে’

সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট নিয়াজ মাহমুদ বলেন, ‘সম্মাননার ভিত্তি হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা ও প্রকৃত অবদান। অথচ এখন কিছু নামসর্বস্ব গোষ্ঠী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে না জানিয়েই তথাকথিত অ্যাওয়ার্ড ঘোষণা করে সেটিকে বাণিজ্যিক প্রচারণার হাতিয়ার বানাচ্ছে। এতে প্রকৃত সম্মাননার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’

আয়েবা’র মহাসচিব কাজী এনায়েত উল্লাহ ইনু বলেন, ‘প্রকৃত স্বীকৃতি আসে কাজের মাধ্যমে। ভূঁইফোড় সংগঠনের সম্মাননা গ্রহণ প্রকৃত সম্মানের বিষয় হতে পারে না। প্রবাসে যারা পরিশ্রম ও মেধা দিয়ে নিজের পরিবার ও দেশের জন্য অবদান রাখছেন, তারাই প্রকৃত সম্মান বয়ে আনছেন।’

অভিযোগ উড়িয়ে দিল সংগঠনটি

অভিযোগ অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফ্রান্স। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মিরাজ সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন সংগঠনের নামে সম্মাননা গ্রহণের অভিযোগ সত্য নয়। এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড আমাদের নজরে আসেনি।’

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দের আইডি থেকেই বিভিন্ন সংগঠনের নামে সম্মাননা গ্রহণের ছবি প্রকাশিত হওয়ায় তাদের এই অস্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কমিউনিটির প্রত্যাশা

ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি বড় অংশ চান, ভূঁইফোড় সংগঠনের এই অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক। প্রকৃত সম্মান ও স্বীকৃতি যেন কাজের ভিত্তিতে হয়। কেউ যেন অন্যের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রচারণা চালাতে না পারেন।

প্রবাসীরা মনে করছেন, গণমাধ্যম ও কমিউনিটি নেতাদের এ বিষয়ে আরও সচেতন ও জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন। আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিকভাবে এই অপকৌশলের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

কারণ প্রবাসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন যাঁরা, তাঁদের নামে কেউ যদি অনৈতিক ও আইনবিরোধী কাজ করেন, তবে তার প্রভাব পড়ে পুরো কমিউনিটির ওপর।

Related posts

Leave a Comment