মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে নতুন ‘প্রবাসী কার্ড’ ঘিরে। সরকার ঘোষিত এই বিশেষ পরিচয়পত্র কারা পাবেন প্রথমে—এখন তা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। জুলাইয়ের মধ্যেই চালু হচ্ছে এই কার্ড। বৈধ প্রবাসীরা পাবেন ব্যাংকিং সেবা, জরুরি সহায়তা, দেশে ফিরে পুনর্বাসনের সুবিধা। কিন্তু বিএমইটি কার্ডের ব্যর্থতার পর নতুন এই কার্ড কি সত্যিই প্রত্যাশা পূরণ করবে?
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডন, আরব আমিরাতের দুবাই থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার সিওল—বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ‘প্রবাসী কার্ড’। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী জুলাইয়ের মধ্যে চালু হতে যাচ্ছে এই বিশেষ পরিচয়পত্র।
এর আগে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের পর এবার প্রবাসীদের জন্য এমন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বহুল প্রতীক্ষিত এই কার্ড ঘিরে প্রবাসীদের মধ্যে যেমন আশা, তেমনি রয়েছে নানা প্রশ্ন। কারা আগে এই কার্ড পাবেন? কী ধরনের সুবিধা মিলবে? বিএমইটি কার্ডের ব্যর্থতার পর নতুন এই কার্ড কি সত্যিই কাজে আসবে?
কারা আগে পাবেন প্রবাসী কার্ড
জানা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে বৈধভাবে বিদেশে কর্মরত এবং সরকার অনুমোদিত উপায়ে রেমিট্যান্স পাঠানো বাংলাদেশিরাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই কার্ড পাবেন। বিশেষ করে যেসব প্রবাসীর বৈধ পাসপোর্ট, কর্ম অনুমতি এবং নিবন্ধিত তথ্য রয়েছে, তাদের তথ্য যাচাই–বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে কার্ড বিতরণ করা হবে।
প্রথম ধাপে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার শ্রমঘন দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিদের অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। কারণ এসব দেশ থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে। এছাড়া দক্ষকর্মী, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদেরও পরবর্তী ধাপে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশের হাইকমিশন বলছে, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। এর মধ্যে পিএলকেএসের হিসাব অনুযায়ী বৈধ প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় আট লাখ। নির্মাণ, উৎপাদন, সেবাখাত, প্ল্যান্টেশন, কৃষি ও ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে কর্মরত এই প্রবাসীরা বছরে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।
কী কী সুবিধা মিলবে এই কার্ডে
প্রবাসী কার্ডে থাকছে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর পরিচয় ব্যবস্থা। এতে কার্ডধারীর নাম, পাসপোর্ট নম্বর, এনআইডি নম্বর, বিদেশে অবস্থানের তথ্য, কর্মক্ষেত্র এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। অনলাইন ডাটাবেস সংযুক্ত থাকায় জরুরি পরিস্থিতিতে দূতাবাস বা সরকার দ্রুত সহায়তা দিতে পারবে।
কার্ডধারীরা পাবেন নানা ধরনের সুবিধা। বিমানবন্দর সেবায় বিশেষ সহায়তা, ব্যাংকিং ও রেমিট্যান্স সেবায় অগ্রাধিকার, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সুযোগে সহায়তা, সরকারি বিভিন্ন সেবায় দ্রুততা, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণমূলক সুবিধা, জরুরি সহায়তা ও আইনি সহযোগিতা এবং দেশে ফেরার পর পুনর্বাসন সুবিধা থাকছে এই কার্ডে।
ভবিষ্যতে প্রবাসীদের জন্য আলাদা লাউঞ্জ, স্বাস্থ্যসেবা, বিমা সুবিধা এবং সন্তানদের শিক্ষাবিষয়ক সহায়তার কথাও ভাবছে সরকার।
বিএমইটি কার্ডের ব্যর্থতা কি পুষিয়ে উঠবে?
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, বিএমইটি কার্ডে যে তথ্যগুলো আছে, প্রবাসী কার্ডেও সেই বিষয়গুলো থাকবে। তবে এতে আরও বাড়তি কিছু সুবিধা থাকছে, সেই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থাও যুক্ত করা হবে।
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বিএমইটি কার্ড প্রবাসী বাংলাদেশিদের খুব একটা কাজে আসেনি। নতুন করে এই কার্ড চালু করা হলে নাগরিকরা যেন সত্যিকার অর্থে উপকৃত হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে সরকারকে।
বর্তমানে এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেমের (ইপিএস) আওতায় জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) একটি সরকার স্বীকৃত প্রবাসী পরিচয়পত্র দেয়, যেখানে নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা ও কল্যাণ সেবার কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে এটি পেতে নানা ধাপে হয়রানির শিকার হতে হয় প্রবাসীদের।
মালয়েশিয়া বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজি সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘অনেক প্রবাসী দীর্ঘদিন কাজ করে দেশে ফিরে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত।’
জাতীয় নাগরিক কমিটির মালয়েশিয়া ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার ড. এনামুল হক মনে করেন, এই কার্ডকে সময়োপযোগী ও কার্যকর করা অথবা আলাদা প্রবাসী কার্ড চালু করলেই প্রবাসীরা প্রকৃত সুফল পাবেন।
প্রবাসীরা যা বলছেন
মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেক বছর ধরে দেশের জন্য কাজ করছি। সরকার যদি আমাদের জন্য আলাদা পরিচয় ও সুযোগ–সুবিধা দেয়, তাহলে সেটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ হবে।’
আরেক প্রবাসী শরীফুল ইসলাম জানান, ‘প্রবাসীরা বিভিন্ন সময়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। যদি এই কার্ডের মাধ্যমে দূতাবাস ও সরকারি সেবা দ্রুত পাওয়া যায়, তাহলে অনেক উপকার হবে।’
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, বিভাগীয় শহর থেকে জেলা শহর পর্যন্ত প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী সিটি গড়ে তোলা হবে। যাদের কাছে এই কার্ড থাকবে, তারা প্রবাসী সিটিতে আবাসন বা প্লট ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাবেন।
অনিশ্চয়তার বাস্তবতা
মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা সরকারের কাছেও নেই। তবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে, সেই হিসাবে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা অন্তত দেড় কোটি। এর বাইরেও আরও অনেকে আছেন, যাঁদের কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের পাশাপাশি প্রবাসী কার্ড চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকার বলছে, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে এই উদ্যোগ।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে রেমিট্যান্সে বাড়তি প্রণোদনা পাওয়া যাবে এবং দেশে ফেরত প্রবাসীদের সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া হবে।
প্রত্যাশা বাস্তবায়নে সময় যত কম, তত ভালো
সবমিলিয়ে, বহুল প্রত্যাশিত প্রবাসী কার্ড এখন আলোচনার কেন্দ্রে। কবে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্ড বিতরণ শুরু হবে এবং ঘোষিত সুবিধাগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা লাখো বাংলাদেশি প্রবাসী।
শুধু ঘোষণা আর প্রতিশ্রুতির মধ্যেই যেন প্রবাসীদের স্বপ্ন বন্দি না থাকে। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কারণ প্রবাসীরাই দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাঁদের কাছে সময়ের দাবি—প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান অগ্রগতি।
