রাজাকে নিয়ে ‘আপত্তিকর’ কনটেন্ট সরাতে টিকটককে মালয়েশিয়ার আলটিমেটাম

(ছবি: প্রতিকী)
মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিমের নামে ‘আপত্তিকর ও মানহানিকর’ কনটেন্ট ছড়ানোর অভিযোগে টিকটককে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে দেশটির ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) তৈরি ভিডিও ও বিকৃত ছবি বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। অন্যথায় মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে যার সর্বোচ্চ শাস্তি কারাদণ্ড। টিকটক এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

মালয়েশিয়ার রাজপরিবার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা কিছু লেখা বা ছড়ানো হয়, তা সেখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কারণ দেশটির ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রদ্রোহ আইন (সিডিশন অ্যাক্ট) অনুযায়ী রাজপরিবারের বিরুদ্ধে ‘ঘৃণা বা অবজ্ঞা’ ছড়ায় এমন কোনো বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এবার সেই আইনের আওতায়ই টিকটককে কঠোর নির্দেশ দিল মালয়েশিয়ান কমিউনিকেশনস অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া কমিশন (এমসিএমসি)।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (২২ মে) এমসিএমসি জানায়, রাজা সুলতান ইব্রাহিমের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা একটি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে ‘অত্যন্ত আপত্তিকর, মিথ্যা, হুমকিস্বরূপ ও অপমানজনক’ কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মটিকে ‘অনতিবিলম্বে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা’ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শুধু সরানো নয়, ব্যাখ্যও চাওয়া হয়েছে

এমসিএমসি জানিয়েছে, এই আদেশের ফলে টিকটককে তাদের কনটেন্ট মডারেশন নীতি আরও জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভিডিও এবং বিকৃত ছবিসহ ‘আপত্তিকর, মিথ্যা, হুমকিস্বরূপ ও অপমানজনক’ কনটেন্ট বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিতে হবে প্ল্যাটফর্মটিকে।

অর্থাৎ শুধু ভিডিও সরিয়ে ফেললেই চলবে না। কেন তা আগেই বন্ধ করা যায়নি—সেই জবাবদিহিও চাওয়া হয়েছে।

টিকটকের নীরবতা

চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের মালিকানাধীন টিকটক এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মালয়েশিয়ার মতো সংবেদনশীল বাজারে টিকটকের জন্য বিষয়টি বড় রকমের চাপ সৃষ্টি করবে। কারণ দেশটির ইন্টারনেট কমিশনের এ ধরনের সরাসরি হস্তক্ষেপ বিরল নয়, কিন্তু এত কঠোর ভাষা প্রয়োগ মাঝে মধ্যেই দেখা যায়।

রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের কঠোর বাস্তবতা

মালয়েশিয়ায় সাংবিধানিক রাজতন্ত্র বিদ্যমান। রাজপরিবারকে কেন্দ্র করে জনগণের মধ্যে প্রচণ্ড শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে। ১৯৪৮ সালের সিডিশন অ্যাক্টের অধীনে রাজপরিবারের বিরুদ্ধে ‘ঘৃণা বা অবজ্ঞা’ ছড়ায় এমন যেকোনো বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর সর্বোচ্চ শাস্তি কারাদণ্ড।

এই আইন ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত অসংখ্য ব্যক্তি ও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এবার সেই আইনের আওয়তায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক।

শুধু মালয়েশিয়া নয়, আঞ্চলিকভাবে নজর রাখছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে রাজপরিবার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সমালোচনা নিয়ে সংবেদনশীলতা অনেক বেশি। থাইল্যান্ডেও রয়েছে কঠোর ‘লে মাজেস্টে’ আইন, যেখানে রাজার সমালোচনা করলে দীর্ঘ কারাদণ্ড হতে পারে। ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমারেও একই চিত্র। এবার মালয়েশিয়া টিকটকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে এটি নজর কাড়ছে।

সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর জন্য সংকেত

মালয়েশিয়ার এমসিএমসির এই পদক্ষেপ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্যও স্পষ্ট বার্তা—স্থানীয় আইন ও সংবেদনশীলতা মানতে হবে, নইলে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা ও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। যেহেতু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কনটেন্ট এবং বিকৃত ছবি শনাক্ত ও অপসারণ করা এখনো জটিল একটি বিষয়, তাই টিকটকের জন্য এটি কঠিন পরীক্ষা হতে পারে।

মালয়েশিয়ার গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের একাংশ অবশ্য এই নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের দাবি, সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজপরিবারকে নিয়ে বেপরোয়া মন্তব্য ও এআইভিত্তিক ভিডিও সম্প্রতি বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আরেক অংশ সেন্সরশিপের আশঙ্কা করছেন।

যাই হোক, আপাতত টিকটকের চোখ এখন মালয়েশিয়ার আইনি জটিলতার দিকেই। প্ল্যাটফর্মটি কী ব্যাখ্যা দেয় এবং ভবিষ্যতে কীভাবে কঠোর মডারেশন নীতি প্রয়োগ করে—সেদিকেই তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল।

Related posts

Leave a Comment