দখলকৃত পশ্চিম তীরের আল-মুঘাইয়ির গ্রামে নতুন ফিলিস্তিনি শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাসাম আল আসাফ খুব ভোরেই কর্মস্থলে পৌঁছান। গ্রামের জলপাই গাছের ভেতর দিয়ে সূর্য ওঠার সময় তিনি স্কুলের নতুন কাঁটাতারের বেড়া এবং মজবুত করা গেটগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করেন। তিনি জানান, শিক্ষার্থীরা এবং তাদের অভিভাবকরা সবাই ভয়ে আছেন।
ইংরেজি শিক্ষক ওয়াহিদ আবু নায়েম স্মরণ করেন, এপ্রিল মাসে এক হামলার সময় তার ভাই জিহাদকে একজন ইসরায়েলি সেনা হত্যা করেছিল। তিনি বলেন, ঘটনার দিন তিনি শিক্ষার্থীদের স্কুলের গেটের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই এক বসতি স্থাপনকারী তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মোবাইল ফোনের ফুটেজে দেখা যায়, আউস নামে এক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্তটি। ওয়াহিদ জানান, তিনি যখন আউসকে উল্টে দেখেন, তখন তার নাক ও মুখ দিয়ে প্রচুর রক্ত ঝরছিল এবং মাথায় গুলি লেগেছিল। তিনি বলেন, আমরা তাকে হারিয়েছি। শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমের দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে বা মেঝেতে শুয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করার সময়ও স্কুলের ভবনে গুলি আঘাত করছিল।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সেই সময় জানায়, এক রিজার্ভিস্ট সৈন্যসহ বেসামরিক নাগরিকদের বহনকারী একটি গাড়িতে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং ওই রিজার্ভিস্ট গাড়ি থেকে নেমে সন্দেহভাজনদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই রিজার্ভিস্টকে পরে দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং একটি তদন্ত শুরু হয়েছে।
সেই ঘটনার পর থেকে ভয়ের পাশাপাশি হতাহতের সংখ্যাও বেড়েছে। গ্রীষ্মকালে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও গ্রামের ভেতর সামরিক অভিযানের সময় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে আরও দুইজন শিক্ষার্থী এবং স্কুল থেকে সদ্য পাস করা এক ১৯ বছর বয়সী তরুণ নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী উভয় ক্ষেত্রেই দাবি করেছে যে, তাদের বাহিনী একটি সহিংস দাঙ্গার উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জবাবে ব্যবস্থা নিয়েছিল।
রামাল্লার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত আল-মুঘাইয়ির গ্রামটি এখন ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের আউপোস্ট দ্বারা পরিবেষ্টিত। গ্রামের প্রবেশপথে ইসরায়েলি বাহিনী নিয়মিত অস্থায়ী চেকপয়েন্ট পরিচালনা করে। অভিভাবকদের আশ্বস্ত করতে প্রধান শিক্ষক বাসাম আল আসাফ স্কুলের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া এবং গেট মজবুত করেছেন। এছাড়া স্কুলের বাইরে অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন রাখা হয়েছে এবং অনেক অভিভাবক অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য সারাদিন স্কুলের বাইরে অপেক্ষা করছেন। হারুন বিশারা নামে এক অভিভাবক জানান, তিনি সেখানে উপস্থিত থাকেন কারণ এতে শিশুরা তাদের বাবা-মাকে কাছে পেয়ে কিছুটা নিরাপত্তার বোধ করে। তিনি স্বীকার করেন যে, স্কুলের পরিস্থিতি নিরাপদ নয়, তবে বসতি স্থাপনকারীদের হুমকির মুখে তারা গ্রাম ছেড়ে যেতে রাজি নন।
স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে শিক্ষকদের বারবার নির্দেশনা দিতে শোনা যায় যে, কোনো সেনা বা বসতি স্থাপনকারী স্কুলের কাছাকাছি এলে যেন শিক্ষার্থীরা চিৎকার না করে, তাদের কাছে না যায় এবং কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখায়। ক্লাসের সময় জানালার বাইরে বসতি স্থাপনকারীদের দেখা যায়, যারা ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের ক্ষেতে ভেড়া চড়াচ্ছে। শিক্ষক আবু নায়েম বলেন, এপ্রিল মাসের পর থেকে তারা গ্রামের আরও কাছে চলে এসেছে।
গ্রামের অ্যাম্বুলেন্স চালক হাদি আল-নাসান জানান, গত এক বছরে ইসরায়েলি বাহিনীর আচরণে বড় পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের শুরুতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে বসতি স্থাপনকারীদের আক্রমণ কম ছিল, কিন্তু ২০২৬ সালে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন বসতি স্থাপনকারীরা দখলদার সেনাদের পূর্ণ নিরাপত্তা পাচ্ছে। ফলে এ বছর নিহতের সংখ্যা এবং শিশুসহ আহতের সংখ্যা অনেক বেশি। গ্রামের বাসিন্দাদের অনেকে মনে করেন, প্রাপ্তবয়স্কদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করার জন্য বসতি স্থাপনকারীরা এখন পরিকল্পিতভাবে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। জুনে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক তদন্ত প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের জমি থেকে উচ্ছেদের কৌশল হিসেবে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে ইসরায়েল এই প্রতিবেদনকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে নাকচ করেছে। সামি আবু রাহমা নামে এক ভেড়াচাষি জানান, জুলাইয়ের শেষে তার নয় বছর বয়সী ছেলে সালিম পারিবারিক খামারে খেলার সময় গুলিবিদ্ধ হয়। এখনো তার হাতে বুলেট রয়ে গেছে।

