ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে বেশ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িগুলোর জন্য নির্ধারিত ফেডারেল জ্বালানি সাশ্রয় বা ফুয়েল ইকোনমি মানদণ্ড কমানোর সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। সিয়েরা ক্লাব, এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ড এবং সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি গত ২ অক্টোবর এক যৌথ বিবৃতিতে এই আইনি পদক্ষেপের কথা জানায়। তারা মার্কিন আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছে যেন ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে (এনএইচটিএসএ) এই নিয়ম শিথিল করা থেকে বিরত রাখা হয়।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে গাড়িগুলোর জন্য গড়ে প্রতি গ্যালন জ্বালানিতে ৫০ মাইলের বেশি (মাইলস-পার-গ্যালন বা এমপিজি) চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী এই মানদণ্ড কমিয়ে প্রতি গ্যালনে মাত্র ৩৫ মাইলের নিচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই নিয়ম শিথিল করলে চালকদের জ্বালানি বাবদ অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হবে, যা এনএইচটিএসএ-এর নিজস্ব বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে। কিন্তু সংস্থাটি সেই তথ্যকে উপেক্ষা করেছে।
সিয়েরা ক্লাবের 'ক্লিন ট্রান্সপোর্টেশন ফর অল' কর্মসূচির পরিচালক ক্যাথরিন গার্সিয়া এক বিবৃতিতে বলেন, "আমরা ট্রাম্প প্রশাসনকে আদালতে নিয়ে যাচ্ছি। এই অবিবেচকের মতো সিদ্ধান্তটি মূলত বড় বড় তেল কোম্পানি এবং গাড়ি নির্মাতাদের মুনাফাকে মার্কিন পরিবারগুলোর স্বার্থের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।"
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা দাবি করছেন যে, জ্বালানি সাশ্রয়ের এই নিয়মগুলো শিথিল করা হলে দীর্ঘমেয়াদে গাড়ি কেনার খরচ গড়ে প্রায় ১,৩০০ ডলার কমে যাবে। মার্কিন পরিবহন মন্ত্রী শন ডাফি এক বিবৃতিতে বলেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বের কারণে আমরা অবশেষে সেই অবৈধ বাধ্যবাধকতা শেষ করতে পেরেছি, যার মাধ্যমে গাড়ি নির্মাতাদের এমন ব্যয়বহুল বৈদ্যতিক গাড়ি তৈরি করতে বাধ্য করা হচ্ছিল যা সাধারণ মার্কিন পরিবারগুলো কিনতে চায় না।" ট্রিপল এ (AAA)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২ অক্টোবর শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ছিল ৪.৩০ ডলার। এমন সময়েই এই জ্বালানি নীতি নিয়ে দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে।
মার্কিন পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাড়ি নির্মাতাদের জ্বালানি সাশ্রয়ের নিয়ম শিথিল করার ফলে তারা ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী গাড়ি তৈরি করার সুযোগ পাবে এবং গাড়ির স্টিকার মূল্যেও সাশ্রয় হবে। গত মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে নতুন গাড়ির গড় দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে, যা প্রায় ৫০,০০০ ডলারের কাছাকাছি। এছাড়া গাড়ি সস্তা হলে আমেরিকানরা আরও নতুন ও উন্নত নিরাপত্তা সুবিধাযুক্ত মডেল কিনতে উৎসাহিত হবে বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।
এনএইচটিএসএ-এর প্রধান জোনাথন মরিসনও ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতিকে সমর্থন করেছেন। মরিসন বলেন, "গাড়ির দাম কমলে আরও বেশি মার্কিন পরিবার নতুন গাড়ি কিনতে পারবে। বাস্তবসম্মত মানদণ্ড থাকলে গাড়ি নির্মাতারাও ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী গাড়ি ডিজাইন ও তৈরি করার স্বাধীনতা পাবে।" গাড়ি নির্মাতাদের লবিং গ্রুপ 'অ্যালায়েন্স ফর অটোমোটিভ ইনোভেশন'ও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে যে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এনএইচটিএসএ সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে পরিবেশবাদীদের দাবি, জ্বালানির দাম যখন প্রায় পুরো বছর ধরে প্রতি গ্যালনে ৪ ডলারের উপরে রয়েছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসন সাধারণ মানুষের কষ্টকে অবহেলা করছে। সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটির ক্লাইমেট ল ইনস্টিটিউটের আইনজীবী ডেভিড পেটিট বলেন, "গ্যাসোলিনের দাম যখন ঐতিহাসিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, তখন ট্রাম্প ফেডারেল মাইলেজ স্ট্যান্ডার্ড কমানোর জন্য সবচেয়ে অনুপযুক্ত সময়টি বেছে নিয়েছেন।"
সমালোচকরা এনএইচটিএসএ-এর নিজস্ব বিশ্লেষণের কথা উল্লেখ করে বলছেন, নতুন নিয়মের অধীনে কেনা একটি গাড়ির পেছনে একজন চালককে তার জীবদ্দশায় অতিরিক্ত ১,৬২৪ ডলার জ্বালানি বাবদ খরচ করতে হবে। বর্তমান নিয়মে যেখানে জ্বালানি খরচ হতো ১৫,৩৩৩ ডলার, নতুন নিয়মে তা বেড়ে দাঁড়াবে ১৬,৯৫৭ ডলারে। এনএইচটিএসএ নিজেই তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে যে, মানদণ্ড শিথিল করার কারণে আগের তুলনায় জ্বালানি সাশ্রয়ের সুবিধা অনেক কমে যাবে।
২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই জ্বালানি নীতি নিয়ে পরিবেশবাদীদের সাথে তার বিরোধ চলছে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ২০২৫ সালের মধ্যে গাড়িগুলোর জন্য গড়ে ৫৫ এমপিজি অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, ট্রাম্প এসে তা বাতিল করেছিলেন। পরবর্তীতে জো বাইডেন প্রশাসন ওবামা আমলের সেই নিয়মগুলো পুনরুদ্ধার করে, যা এখন আবার ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে শিথিল করার চেষ্টা চলছে।
বাইডেন প্রশাসনের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে গাড়ি নির্মাতাদের এমন গাড়ি তৈরি করতে হবে যা প্রতি গ্যালনে ৫০ মাইলের বেশি যেতে পারে। ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাবে তা কমিয়ে ৩৫ মাইলের নিচে আনা হচ্ছে। এর অর্থ হলো, ১৫ গ্যালন ধারণক্ষমতার একটি সাধারণ তেলের ট্যাংকের গাড়ি ৫০ এমপিজি-র তুলনায় ৩৫ এমপিজি-তে চললে প্রতিবার ট্যাংক পূর্ণ করার পর ১২৫ মাইল কম পথ চলতে পারবে। তবে মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার (ইপিএ) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর গাড়ি নির্মাতাদের গড় মাইলেজ ছিল মাত্র ২৭ এমপিজি, যা এক ট্যাংকে প্রায় ৩৭৫ মাইল চলার সমান।
পাবলিক সিটিজেনের কো-প্রেসিডেন্ট রবার্ট উইসম্যান বলেন, "নতুন গাড়ি কেনার সময় ক্রেতাদের আরও বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী মডেল বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। তারা এমন গাড়ি পাওয়ার যোগ্য যা প্রতি গ্যালনে এবং প্রতি ডলারে বেশি মাইল পথ চলতে পারে।"

