ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের গবেষণার তহবিল ও সচেতনতা বাড়াতে এক পায়ে পুরো দেশ জুড়ে দৌড়েছিলেন তিনি। চার দশক পর সেই কিংবদন্তি টেরি ফক্সের গল্প কানাডার নাগরিকদের মধ্যে আবারও অভূতপূর্ব ঐক্য ও দেশপ্রেমের জোয়ার নিয়ে এসেছে। ২০২৬ সালে এসে টেরি ফক্সের এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন এক সুতোয় বাঁধা পড়ছে।
১৯৮০ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি এক দুপুরের কথা। টরন্টোর ব্যস্ততম একটি রাস্তায় তখন উপচে পড়া ভিড়। ছয় বছর বয়সী শিশু রব স্টিকল তার মায়ের কাঁধে চড়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল ‘দ্য এম্পায়ার স্ট্রাইকস ব্যাক’ চলচ্চিত্রটি দেখার জন্য। ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্যে শোরগোল পড়ে যায়। স্টিকল দেখতে পায়, এক তরুণ অদ্ভুত ভঙ্গিতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছেন। স্টার ওয়ার্সের অন্ধ ভক্ত স্টিকল তখন তার মাকে বলেছিল, ‘মা, দেখো! ওর একটা রোবটের পা আছে।’
সেই তরুণটি ছিলেন ২১ বছর বয়সী টেরি ফক্স, যিনি তখন পুরো কানাডা জুড়ে তাঁর ঐতিহাসিক ‘ম্যারাথন অব হোপ’ বা আশার ম্যারাথনের অর্ধেকেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন। প্লাস্টিক, চামড়া আর ধাতু দিয়ে তৈরি একটি সাধারণ ও অনুপযুক্ত কৃত্রিম পা নিয়ে প্রায় ২,২০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে টরন্টোতে পৌঁছেছিলেন তিনি। বর্তমানে টরন্টোর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রব স্টিকল সেই স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, ‘তখন হয়তো বুঝতে পারিনি আমরা কত বড় এক ইতিহাসের অংশ হচ্ছিলাম। কিন্তু পরে যখন আমি আমার মাকে ক্যান্সারে হারাই এবং নিজে শিক্ষক হই, তখন বুঝতে পেরেছি আমরা এক অনন্য সাধারণ মানুষকে দেখেছিলাম। যিনি স্বেচ্ছায় এমন এক পথ বেছে নিয়েছিলেন যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন এই উদ্দেশ্যটি সফল হওয়া জরুরি।’
কানাডায় টেরি ফক্সের জাতীয় বীরের মর্যাদা নিয়ে কখনোই কোনো সংশয় ছিল না। তবে বর্তমানে যখন দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন তাঁর এই গল্প দলমত নির্বিশেষে সবার প্রশংসা কুড়াচ্ছে। কানাডার বাইরে অনেকের কাছেই এটি বিস্ময়কর মনে হতে পারে যে, ফক্স কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং একটি জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর নামে দেশটির ডজনখানেক সড়কের নামকরণ করা হয়েছে, রয়েছে ১৪টি স্কুল এবং একটি পর্বত। দেশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর ভাস্কর্য। কানাডা সরকার তাঁর ছবি দিয়ে ডাকটিকিট ও মুদ্রা প্রকাশ করেছে। পার্কস কানাডা তাঁকে ‘ন্যাশনাল হিস্টোরিক পারসন’ হিসেবে ঘোষণা করে ‘ব্যক্তিগত সাহসের এক চিরন্তন প্রতীক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশে আয়োজিত ‘টেরি ফক্স রান’ বর্তমানে ক্যান্সার গবেষণার জন্য বিশ্বের বৃহত্তম এক দিনের তহবিল সংগ্রহের কর্মসূচি। তাঁর নামে এ পর্যন্ত ১ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের (৭১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
টেরি ফক্সের এই উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি নতুন করে কানাডীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটছে। জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ব্রায়ান অ্যাডামস সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাথে ফক্সের একটি স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেন। ‘সামার অব ৬৯’ খ্যাত এই গায়ক টেরি ফক্সকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘দ্য ব্যালাড অব টেরি ফক্স’ নামে একটি নতুন গানও তৈরি করেছেন।
পাশাপাশি, ১৯ সেপ্টেম্বর টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হতে যাচ্ছে ‘রান টেরি রান’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র। আশির দশকের পূর্বে অপ্রকাশিত কিছু ফুটেজ নিয়ে নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্রে এক লাজুক কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তরুণের গল্প তুলে ধরা হয়েছে, যা একসময় পুরো দেশের হৃদয় জয় করেছিল এবং পরে তা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। চলচ্চিত্রটি এই মিথ ভেঙে দেয় যে ফক্স প্রথম দিন থেকেই পুরো দেশের সমর্থন পেয়েছিলেন; বরং শুরুতে কীভাবে তিনি চরম একাকীত্ব ও অবহেলার মধ্যে শত শত মাইল পথ পাড়ি দিয়েছিলেন, তা এখানে উঠে এসেছে। প্রামাণ্যচিত্রটির পরিচালক শন মেনার্ড বলেন, ‘তাকে দৌড়াতে দেখে যেকোনো কানাডিয়ানের অনুপ্রাণিত ও আবেগাপ্লুত না হয়ে উপায় নেই।’
ব্রিটিশ কলম্বিয়ার এক উদ্যমী ক্রীড়াবিদ ছিলেন টেরি ফক্স। ১৯৭৭ সালে অস্টিওসারকোমা (হাড়ের ক্যান্সার) আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়। পরিচালক মেনার্ড বলেন, ‘আজ তাঁকে প্রায় সুপারহিরো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু তিনি ছিলেন সাধারণ একজন মানুষ, যাকে ক্যান্সার ওয়ার্ডে অন্য শিশুদের মৃত্যু চেয়ে চেয়ে দেখতে হয়েছিল।’
ক্যান্সার আক্রান্ত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব দেখে ক্ষুব্ধ ফক্স ১৯৮০ সালে এক বিশাল লক্ষ্য স্থির করেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ক্যান্সার গবেষণার অর্থ সংগ্রহের জন্য তিনি পুরো কানাডা জুড়ে দৌড়াবেন। ১৯৮০ সালের ১২ এপ্রিল নিউফাউন্ডল্যান্ডের সেন্ট জনস-এ আটলান্টিক মহাসাগরের পানিতে পা ভিজিয়ে তিনি প্রায় ৫,০০০ মাইলের এই যাত্রা শুরু করেছিলেন।
‘রান টেরি রান’ প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, পরিবার ও বন্ধুদের সামান্য সহায়তায় অত্যন্ত বিপজ্জনক রাস্তা, ক্লান্তি, তীব্র গরম, বৃষ্টি, বাতাস ও শারীরিক যন্ত্রণা উপেক্ষা করে ফক্স তাঁর যাত্রা অব্যাহত রেখেছিলেন। প্রতিদিন একটি করে পূর্ণ ম্যারাথন (২৬ মাইল) দৌড়াতেন তিনি। মেনার্ড বলেন, ‘আমি একটি সাড়ে তিন মিনিটের ফুটেজ পেয়েছি যেখানে দেখা যায় তিনি শুধু একটি পাহাড়ের ওপর দৌড়ে উঠছেন। আর বারবার তাঁর কৃত্রিম পায়ের চামড়ার স্ট্র্যাপটি ঠিক করছেন, কারণ ওটি দৌড়ানোর জন্য নয়, শুধু হাঁটার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।’
ধীরে ধীরে ফক্সের এই যাত্রার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেন এবং টরন্টোতে পৌঁছানোর পর বীরোচিত সংবর্ধনা পান। প্রামাণ্যচিত্রে তাঁর একটি আবেগঘন মুহূর্তও ধরা পড়েছে, যেখানে ক্যান্সার আক্রান্ত এক ১০ বছরের শিশুর সাথে কাটানো সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি জনসম্মুখে কেঁদে ফেলেন। অনুদানের টাকা যখন তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য ১ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ছাড়িয়ে যায়, তখনও তিনি কোনো বাণিজ্যিক প্রচারণায় নিজের নাম ব্যবহার করতে রাজি হননি। উত্তর অন্টারিওর কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার পর ফক্স আশাবাদী ছিলেন যে সবচেয়ে কঠিন সময় তিনি পার করে এসেছেন। কিন্তু আগস্টের শেষের দিকে তাঁর ফুসফুসে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ায় তিনি প্রচণ্ড কাশি ও ক্লান্তিতে আক্রান্ত হন।
অবশেষে ১৯৮০ সালের ১ সেপ্টেম্বর, ১৪৩ দিনে ৩,৩৩৯ মাইল পথ পাড়ি দেওয়ার পর অন্টারিওর থান্ডার বে-র বাইরে এসে টেরি ফক্স থামতে বাধ্য হন। ২ সেপ্টেম্বর তিনি অশ্রুসজল চোখে তাঁর ‘ম্যারাথন অব হোপ’ স্থগিত করার ঘোষণা দেন। পরবর্তী জুনে তিনি মারা যান।
ব্রায়ান অ্যাডামস তাঁর নতুন গানে লিখেছেন, “পিচ আর নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে, তাপ আর বৃষ্টির মধ্য দিয়ে, ছাব্বিশ মাইল ধরে সে বয়ে নিয়েছিল দেশের ভার, তারপর সে আবার চলত।” অ্যাডামস বলেন, ‘আমি এই অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের গল্পটি গানে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। এটি কানাডায় একটি কিংবদন্তি হয়ে উঠছে এবং এটি হওয়া উচিত, কারণ এটি একজন মানুষের লড়াইয়ের এক অসাধারণ মহাকাব্য।’
টেরি ফক্সের বন্ধু রিক হ্যানসেন, যিনি ফক্সকে ভ্যাঙ্কুভারে হুইলচেয়ার বাস্কেটবল খেলার জন্য দলে নিয়েছিলেন, তিনিও টেরি ফক্সের এই অদম্য স্পৃহা স্মরণ করেন। হ্যানসেন নিজে হুইলচেয়ারে করে ২৫,০০০ মাইলের বিশ্বভ্রমণ সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি স্মরণ করেন, একদিন তাঁর হোন্ডা সিভিক গাড়িতে বসে বৃষ্টির মধ্যে ড্রাইভ করার সময় টেরি প্রথম তাঁকে এই পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। হ্যানসেন তখন বলেছিলেন, ‘টেরি, তোমার একটি দল প্রয়োজন। কারণ এমন দিন আসবে যখন শুধু নিজের জোরে তুমি এগিয়ে যেতে পারবে না।’
তবে বর্তমানের এই জাতীয়তাবাদী আবেগের মধ্যেও টেরি ফক্সকে অতিমানব বা ঈশ্বরের আসনে বসানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন হ্যানসেন। তিনি বলেন, ‘টেরি কখনোই চাইতেন না আমরা তাঁকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাই যেখানে আমরা নিজেদের সাথে তাঁর কোনো মিল খুঁজে পাব না। টেরি ছিলেন আমাদের মতোই একজন সাধারণ কানাডীয়। কিন্তু তিনি দেখিয়েছেন যে অসাধারণ সংকল্প ও উদ্দেশ্য থাকলে একজন সাধারণ মানুষও কী করতে পারে।’

