ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে বসন্তের পর সবচেয়ে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই হামলায় মূলত কিয়েভ এবং এর আশপাশের অঞ্চলকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। দেশব্যাপী চালানো এই হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে কিয়েভ অঞ্চলে এক শিশু রয়েছে।
ইউক্রেনের বৃহত্তম বেসরকারি জ্বালানি কোম্পানি ডিটিইকে (DTEK) জানিয়েছে, রাজধানী কিয়েভে একটি কঠিন রাত পার করার পর প্রায় ৮,০০০ বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, তাদের লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল কিয়েভের প্রধান বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কেন্দ্র ট্রিপিলস্কা পাওয়ার স্টেশন। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির অপারেটর সেখানে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী টেলিগ্রামে লিখেছেন, গ্রীষ্মের পর থেকে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় প্রায় প্রতিদিনই শত্রু পক্ষের হামলা চলছে। তবে গত হিটিং মৌসুমের শেষ হওয়ার পর থেকে এই মাত্রার সম্মিলিত ও বড় ধরনের হামলা এবারই প্রথম। ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসন শুরুর পর থেকে প্রতি শীতেই ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিড লক্ষ্য করে রাশিয়া এমন দীর্ঘমেয়াদী হামলা চালিয়ে আসছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, গত রাতে ইউক্রেনের ১১টি অঞ্চলে হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় আবাসিক ভবন, সামাজিক অবকাঠামো, বেসামরিক শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ঝিতোমির, মাইকোলাইভ, কিরোভোহরাদ এবং রিভনে অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় আঘাত হানা হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার কিয়েভ, দিনিপ্রোপেত্রভস্ক, দোনেৎস্ক, সুমি এবং খারকিভ অঞ্চলের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকায় রাষ্ট্রীয় গ্রিড অপারেটর ইউক্রেনার্গো স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয় এমন যন্ত্র ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছে।
কিয়েভে বিস্ফোরণের শব্দে রাত কাটার পর বুধবার সকালে শহরটি ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুলির শব্দ শোনা গেছে এবং বাসিন্দাদের জানালা বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিয়েভ অঞ্চলের প্রধান তিমুর তকাচেঙ্কো জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে এক শিশুর মরদেহ পাওয়া গেছে। কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো জানান, রাজধানীতে মোট তিনজন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে একটি গুদামঘরে কর্মরত ইউক্রেনীয় ইউটিলিটি কোম্পানির একজন কর্মী রয়েছেন। এছাড়া দক্ষিণ মাইকোলাইভ অঞ্চলে একজন এবং উত্তর-পূর্বের সুমি অঞ্চলে মঙ্গলবার আরও দুজন নিহত হয়েছেন, যেখানে একটি স্কুলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে এবং কিয়েভ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ট্রিপিলস্কা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করত। সেন্টারএনার্গো কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করছে। এদিকে, রাশিয়া দাবি করেছে যে তারা মস্কোসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইউক্রেনের ৩৮০টিরও বেশি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে তারা দোনেৎস্কের দখলকৃত অঞ্চলে রাশিয়ার একটি ড্রোন গুদামসহ বেশ কিছু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে দোনেৎস্কের লাইমান শহরের কাছে ইউক্রেনের থার্ড আর্মি কোর ‘অপারেশন ভিভাল্ডি’ নামক পাল্টা অভিযানের অংশ হিসেবে বেশ কিছু বসতি পুনরুদ্ধার করেছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বুধবার সেখানে সেনা সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তবে ফ্রন্টলাইনের অন্যান্য অংশে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি।

