মাদ্রিদের কেন্দ্রস্থলে নিজের দীর্ঘদিনের ভাড়া বাসা থেকে উচ্ছেদ হওয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় মারিয়া দেল কারমেন আবাসকাল নামের ৮৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে। 'মারিকারমেন' নামে পরিচিত এই বৃদ্ধার মৃত্যু স্পেনের আবাসন সংকট ও উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলনকে নতুন করে উস্কে দিয়েছে। আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দেশটির জাতীয় নির্বাচনের আগে এই ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনকেও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ মারিকারমেনকে তার দীর্ঘ ৭০ বছরের ঠিকানা থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী এই বৃদ্ধাকে স্ট্রেচারে করে বাসা থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার টেলিভিশন ফুটেজ পুরো স্পেনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে গত বুধবার তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তার আইনজীবী মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ প্রকাশ করেননি।
আন্দোলনকারীদের বিশ্বাস, এই উচ্ছেদের ধকল সহ্য করতে না পেরেই মারিকারমেনের মৃত্যু হয়েছে। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় পুয়ের্তা দেল সল চত্বরে জড়ো হন হাজারো মানুষ। সেখানে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রায় এক হাজার মানুষ তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন। মারিকারমেনের স্মরণে সেখানে মোমবাতি, ফুল ও চিঠি দিয়ে একটি অস্থায়ী স্মৃতিস্থল তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া রেতিরো পার্কের কাছে তার পুরনো বাসার দরজায় কালো হৃদয়ের ছবি এঁকে লেখা হয়েছে, "শান্তিতে ঘুমাও মারিকারমেন।" রাস্তার পাশে রেখে যাওয়া একটি চিঠিতে লেখা ছিল, "আপনার মৃত্যু বৃথা যাবে না। আমরা আমাদের লড়াই চালিয়ে যাব।"
মাদ্রিদ টেন্যান্টস ইউনিয়ন বৃহস্পতিবার নতুন করে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে। বার্সেলোনাসহ অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও একই ধরনের অবস্থান ধর্মঘট চলছে। পুয়ের্তা দেল সল চত্বরে অবস্থান নেওয়া ২৮ বছর বয়সী রিশেপশনিস্ট মারিয়া হোলগাডো বলেন, "তিনি ছিলেন সেই অগ্নিশিখা যা আমাদের এই অবস্থান ধর্মঘট শুরু করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর মৃত্যু আমাদের স্তব্ধ ও ব্যথিত করেছে, তবে এটি আমাদের অধিকার আদায়ে লড়াই করতে আরও শক্তি জোগাবে, যাতে আর একটিও এমন হত্যাকাণ্ড না ঘটে।" হোলগাডো আরও বলেন, "এর সব দায় সেইসব সম্পত্তি মালিক ও শকুন তহবিলের (ভলচার ফান্ড) ওপর বর্তায়, যা মানুষের মৌলিক অধিকারকে পুঁজি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।" হোলগাডো ও তার সঙ্গী কেবল একটি ছোট এক কক্ষের অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। রিয়েল এস্টেট ওয়েবসাইট 'আইডিয়ালিস্টা'র তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে স্পেনে গড় বাড়িভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এই ঘটনা স্পেনের রাজনীতিতেও বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ উচ্ছেদ বন্ধ এবং আবাসন খাতে ফাটকাবাজি রোধে জরুরি আইন পাসের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ডানপন্থী দলগুলো সংসদে তা আটকে দিলে সানচেজ আগাম নির্বাচনের ডাক দেন। আগামী ২৯ নভেম্বরের নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রগতিশীল ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ করতে সানচেজ আবাসন ইস্যুটিকে সামনে আনছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মারিকারমেনের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সানচেজকে তার সোশ্যালিস্ট পার্টির সঙ্গে বামপন্থী দল 'সুমার'-এর (যা এই নির্বাচনে 'ফ্রেন্তে আমপ্লিও' নামে অংশ নিচ্ছে) জোট বজায় রাখতে হবে।
মাদ্রিদের কমপ্লুটেন্স ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলেহান্দ্রো কিরোগা বলেন, "রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর এই মৃত্যু এই ধারণাকেই সত্য প্রমাণ করল যে, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং আবাসন খাতের ফাটকাবাজি আক্ষরিক অর্থেই মানুষের জীবন কেড়ে নেয়।" তবে মাদ্রিদের রক্ষণশীল মেয়র হোসে লুইস মার্টিনেজ-আলমেইদা প্রধানমন্ত্রী সানচেজের বিরুদ্ধে এই মৃত্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, "আমার সমবেদনা? হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। কিন্তু ২৯ নভেম্বরের নির্বাচনে সানচেজের প্রচারণায় অংশ নেওয়া? না, কখনোই নয়।"

