কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) কি মানুষের নৈতিকতা দখল করে নেবে বা মানবজাতিকে মুছে ফেলার ক্ষমতা অর্জন করবে—এই বিতর্কে মত্ত পুরো বিশ্ব। তবে এআই-এর সম্ভাব্য হুমকির বাইরেও বর্তমানে সবচেয়ে বড়, অনিবার্য এবং প্রমাণিত যে হুমকি মানবজাতির অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে, তা হলো পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি। এই বিষয়ে বিশ্বজুড়ে এক ধরণের অদ্ভুত বধিরতা ও অন্ধত্ব কাজ করছে। হিরোশিমার ৮১ বছর পার হওয়ার পর, পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি যে হারে বাড়ছে, তাতে প্রশ্ন উঠেছে আমাদের ভাগ্য আর কতদিন সহায় হবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন যে, ১৯৮৯ সালের পর থেকে বিশ্ব এখন পারমাণবিক দিক থেকে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তে রয়েছে। গত বছর বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে ব্যয় প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে ব্যয় বেড়েছে ২০ শতাংশ। এছাড়া এআই-এর ব্যবহার পারমাণবিক কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল ব্যবস্থার অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে জাতিসংঘকে জানানো হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশন (এসিএ)-এর প্রধান ড্যারিল কিম্বল সতর্ক করে বলেছেন, প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের নিরস্ত্রীকরণ আলোচনার অভাব রয়েছে এবং কৌশলগত অস্ত্র সীমাবদ্ধকরণ চুক্তিগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। নতুন কোনো অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি না হলে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক নজিরবিহীন ত্রিমুখী পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ ও নিয়মকানুনের ক্রমাবনতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ট্রাম্প-যুগের সেই বিতর্কিত ধারণা—যেখানে আন্তর্জাতিক আইন বা নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি উপেক্ষা করা হয় এবং শক্তিশালী শাসকরা জাতিসংঘের সনদ বা মানবাধিকারের তোয়াক্কা করেন না—তা বিশ্বকে পারমাণবিক অরাজকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফিলিস্তিন, ইরান, ইউক্রেন, মিয়ানমার, ইয়েমেন ও সুদানে চলমান যুদ্ধগুলো পরোক্ষভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের উপাদান হিসেবে কাজ করছে।
মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে চাঁদে পারমাণবিক শক্তিচালিত ঘাঁটি তৈরির দৌড়ও উদ্বেগজনক। ১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস চুক্তি অনুযায়ী চাঁদ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, কিন্তু ইলন মাস্ক এবং জেফ বেজোসের মতো ধনকুবেররা এই চুক্তি বারবার লঙ্ঘন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ মহাকাশকে অস্ত্রায়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়া কক্ষপথে পারমাণবিক অস্ত্রবাহী অ্যান্টি-স্যাটেলাইট প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
রাজনৈতিক নেতাদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের চেয়েও বেশি বিস্ময়কর হলো জনমনে বিরাজমান নীরবতা। বিশ্বজুড়ে এই ধ্বংসের যাত্রার বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের প্রতিবাদ নেই, বরং এক ধরণের উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদি শেষ পর্যন্ত এই ধ্বংসলীলা শুরু হয়, তবে যারা নীরব ছিলেন, তারাও নিজেদের ধ্বংসের জন্য দায়ী থাকবেন। হিরোশিমা কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের একটি সতর্কবার্তা।

