শিক্ষার্থী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর ডাকে ফ্রান্সে শুরু হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ একাধিক শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের তীব্র সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতিকে "সহিংসতার মারাত্মক বৃদ্ধি" বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
দিনভর চলা এই বিক্ষোভে দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাজপথে নামেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অন্তত ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
বিক্ষোভের জেরে দেশটির বিভিন্ন নগরীতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্যারিস ও অন্যান্য অঞ্চলের বেশ কয়েকটি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয় দুষ্কৃতকারীরা। লিমোজ শহরে নগর ভবনে (টাউন হল) ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঐতিহ্যবাহী ভবনটির ছাদের একাংশ ধসে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মতে, টাউন হলের বড় একটি অংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
একই সঙ্গে লিয়োঁ শহরের পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে শহরটির জন্য এক হৃদয়বিদারক ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন সেখানকার মেয়র গ্রেগরি দুসে।
বিএফএমটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত সুপরিচিত ভবনটি পুড়ে যাওয়া শহরের মানুষের জন্য অত্যন্ত বেদনার। স্থানীয় পুলিশ জানায়, একদল উগ্র মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি দমকলকর্মীদের বাধা দেওয়ায় আগুন নেভাতে বেশ সমস্যা পোহাতে হয়।
রাজধানী প্যারিসে বিকেলের দিকে মূল পদযাত্রাটি প্রধানত শান্তিপূর্ণই ছিল। সেখানে অংশ নেওয়া একদল তরুণ বিবিসিকে জানান, তারা "শান্তিকামী" এবং কেবল পরিস্থিতির পরিবর্তন চান, কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের রিপাবলিক স্কয়ারসহ বিখ্যাত বিভিন্ন স্থানে রাজপথে আগুন জ্বালানো শুরু হয় এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
প্যারিসে 'লা বারিক' নামের একটি বারসহ অন্তত একটি রেস্তোরাঁ আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয় এবং খাবারের দোকান ও পোশাকের বিপণিতে লুটপাট চালানো হয়। কয়েক স্থানে অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ শুরু হলে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার করে এবং একাধিক স্থানে লাঠিচার্জ চালিয়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়েজ জানিয়েছেন, সংঘাতময় পরিস্থিতিতে অন্তত ৬০ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুজনকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অন্যদিকে সেন্ট-এতিয়েন শহরের মেয়র রেগিস জুয়ানিকো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, সেখানে একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক তরুণ বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
এমন মর্মান্তিক ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, রেন, তুলুজ এবং অঁজের সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় মুখোশধারী ব্যক্তিরা পরিকল্পিত সহিংসতা চালিয়েছে। লিল শহরের একটি অ্যাপল স্টোরে ঢুকে ভেতরের সব মালামাল লুট করা হয়। এছাড়া গ্রেনোবল, আভিঁও, পো, মোঁপেলিয়ে এবং ভালঁস শহরেও বহু ভবনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
গ্রেনোবল শহরে একটি পর্যটন ট্রেনে মুখোশধারী কিছু লোক চেপে সরু গলি দিয়ে তিনজন দাঙ্গা পুলিশ অফিসারের দিকে চালিয়ে দেওয়ার একটি ভিডিও যাচাই করে সত্যতা নিশ্চিত করেছে বিবিসি ভেরিফাই।
উল্লেখ্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের লাইসি বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট ও ভগ্ন অবকাঠামোর প্রতিবাদে আন্দোলন করছিল হাজার হাজার শিক্ষার্থী। আন্দোলন প্রশমনে গত ৮ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে অতিরিক্ত ৩,০০০ শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিক্ষোভ থামেনি।
পরবর্তীতে শনিবার এই আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দেয় শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এবং 'জিলে জোন' বা 'হলুদ ভেস্ট' আন্দোলনকারীরা। ২০১৮ সাল থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে টানা এক বছর আন্দোলন চালিয়ে ফরাসি ইতিহাসের দীর্ঘতম বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল এই হলুদ ভেস্ট গোষ্ঠী।
আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফ্রান্স যখন এক গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, ঠিক তখনই এই তীব্র বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে ন্যাশনাল র্যালির মারিন ল্য পেন এবং চরম বামপন্থি দল লা ফ্রান্স অনসোমিজের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশঁর মধ্যে।
সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভে মেলঁশঁ নিজে অংশ নেন এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কড়া সমালোচনা করে বলেন, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার নিন্দাও জানান।
মেলঁশঁর এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান ল্যকরনু একে "বিপজ্জনক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত" বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, পুলিশ চরম সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছে এবং কিছু দল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আন্দোলনকে মহড়া হিসেবে ব্যবহার করছে।
সহিংসতা চালিয়ে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। দূর-ডানপন্থি নেত্রী মারিন ল্য পেন অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীদের যৌক্তিক দাবিগুলোকে চরম বামপন্থিরা জিম্মি করে ফেলেছে এবং মেলঁশঁ সহিংসতায় ইন্ধন দিচ্ছেন।
সমগ্র পরিস্থিতি নিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন, "যারা সরকারি কার্যালয় ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে, ভাঙচুর করেছে এবং টাউন হল লুট করেছে, তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।"

