জোহানেসবার্গে নাগরিক সেবায় ধস: স্থানীয় নির্বাচনে চাপের মুখে এএনসি

দক্ষিণ আফ্রিকার সর্ববৃহৎ নগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানী জোহানেসবার্গে বিদ্যুৎ ও পানি সংকট, সড়কজুড়ে খানাখন্দ এবং বর্জ্যের স্তূপকে কেন্দ্র করে নাগরিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ৪ নভেম্বরের আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই নাগরিক দুর্ভোগ ক্ষমতাসীন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দেশটির ২৫৭টি পৌরসভার এই নির্বাচনে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

জোহানেসবার্গের অ্যালেক্সান্দ্রা টাউনশিপের রাস্তা ও ফুটপাতে তীব্র গরমে পচতে থাকা বর্জ্যের স্তূপ জমে রয়েছে। এখানকার জুকসকেই নদীর দুই তীর ইট-পাথরের ধ্বংসাবশেষ ও ময়লা-আবর্জনায় প্রায় অবরুদ্ধ, আর নদীর কালভার্ট দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা পানি। পরিবেশবাদী সংগঠন 'অ্যালেক্সান্দ্রা ওয়াটার ওয়ারিয়র্স'-এর প্রধান নির্বাহী সেমাদি মাঙ্গানিয়ে নদীর পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করেন এবং তীর ধরে গাছ লাগান। শহরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "আমাদের সমস্যার শেষ নেই। বিদ্যুৎ না থাকলে পানির সংকট, আর পানি থাকলে জমে থাকে বর্জ্য।" ২০১১ থেকে ২০২২ সালের আদমশুমারিতে শহরের জনসংখ্যা ১০ শতাংশ বেড়ে ৪.৮ মিলিয়নে পৌঁছানোর বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণ বোঝা গেলেও এই সংকট আগেই অনুমান করা গিয়েছিল এবং তা প্রশমনে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।

সারা দেশের পৌরসভাগুলোতে পরিষেবা সরবরাহের এই নাজুক অবস্থা স্বীকার করেছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাপোসাও। তিনি জানান, বহু পৌরসভা জনগণের মৌলিক চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটির অডিটর জেনারেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫৭টি স্থানীয় সরকারের মধ্যে মাত্র ৩৯টি (১৫ শতাংশ) স্বচ্ছ অডিট পেয়েছে। এছাড়া পার্লামেন্টারি বাজেট অফিসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের দুই-তৃতীয়াংশ পৌরসভাই বর্তমানে মারাত্মক আর্থিক সংকটে ভুগছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনৈতিক কেন্দ্র জোহানেসবার্গের পরিস্থিতি সবচেয়ে সংকটজনক। গত এক দশকে ১০ বার মেয়র পরিবর্তনের মাধ্যমে অস্থিতিশীল জোট সরকার দিয়ে এটি পরিচালিত হয়ে আসছে। নগর কর্তৃপক্ষ নিজেরাও স্বীকার করেছে যে, সেখানকার পরিকাঠামো খাতে ব্যাকলগ বা বকেয়া ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২০ বিলিয়ন র্যান্ড (প্রায় ৯.৯ বিলিয়ন পাউন্ড)। এছাড়া মিউনিসিপ্যাল সংস্থা 'জোহানেসবার্গ ওয়াটার' যে পরিমাণ পানি কেনে, তার চারভাগের একভাগই (২৫ শতাংশ) পাইপলাইনের লিকেজের কারণে নষ্ট হয়ে যায়।

সম্প্রতি শহরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাবি রিজ টাউনশিপে আয়োজিত এক গণশুনানিতে মেয়র দাদা মোরেরো এবং বিদ্যুৎ সংস্থা 'সিটি পাওয়ার'-এর কর্মকর্তাদের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রায় ৪০০ বাসিন্দা। সভায় এক নারী অভিযোগ করেন, গত ছয় মাস ধরে তার বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। আরেক নারী জানান, প্রতি মাসে ২,০০০ র্যান্ড পেনশন পাওয়া সত্ত্বেও ৬,০০০ র্যান্ড পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল আসার কারণে তার বৃদ্ধা মা সুদের কারবারিদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন। সভার এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যদি কোনো প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে থাকে, তবে সেটি এই সংস্থাটি। এটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।" তার এই বক্তব্যে মিলনায়তনজুড়ে উপস্থিত জনতা করতালি দিয়ে সমর্থন জানান।

নাগরিক সেবার এই সংকট কেবল দরিদ্র টাউনশিপেই সীমাবদ্ধ নেই, মেলভিল ও ওয়েস্টডিনের মতো উত্তর শহরতলীর তুলনামূলক ধনী এলাকাগুলোতেও সপ্তাহের পর সপ্তাহ পাইপলাইনের পানি থাকছে না। সেপ্টেম্বর থেকে সেখানকার বাসিন্দারা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না কখন তারা পানি পাবেন। মেলভিলের অর্ধ-অবসরপ্রাপ্ত ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট কেট স্পিলার বলেন, পরিস্থিতি এতটাই হতাশাজনক যে একদমই পানি মিলছে না। দিনে মাঝেমধ্যে দু-এক ফোঁটা পড়ে, আর মাঝরাতে তার স্বামী কয়েকবার চেষ্টা করে কয়েকটি পাঁচ লিটারের বোতল ভরতে পারেন। স্পিলার ও তার স্বামীকে বালতি দিয়ে গোসল করার পানি সংগ্রাহে প্রতিদিন প্রায় ১০ মিনিট গাড়ি চালিয়ে টিউবওয়েল থাকা একটি মসজিদে যেতে হয়, সেখান থেকে তারা ডজনখানেক বোতল ভরে আনেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এভাবে জীবনযাত্রা থমকে গেছে, সব সময় কীভাবে পানি সংগ্রহ করা যায় তা নিয়েই পরিকল্পনা করতে হয়।

রাবি রিজের সভা শেষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেয়র দাদা মোরেরো দাবি করেন, সামগ্রিকভাবে জোহানেসবার্গ নগরী তার অধিবাসীদের প্রয়োজনীয় পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছে এবং কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু সমস্যাগ্রস্ত এলাকায় তারা এখন নজর দিচ্ছেন। শহরের মধ্যবর্তী এলাকার কিছু অংশে সাবস্টেশন ভেঙে পড়ার কারণে বিদ্যুৎ নেই স্বীকার করে তিনি এর পেছনে অপরাধী ও ভাঙচুরকারীদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, জোহানেসবার্গ মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে (জেপিএমডি) সাথে নিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করা হলেও শক্তিশালী অপরাধী সিন্ডিকেট অবকাঠামোর ক্ষতি করে চলেছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতিকেই নাগরিক সেবার এই পঙ্গু দশার মূল কারণ বলে মনে করছেন। 'গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ এগেইনস্ট Transnational Organized Crime'-এর অক্টোবর মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, জোহানেসবার্গ সিটির শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা একটি অপরাধমূলক বাস্তুতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। খাউতেং সিটি-রিজন অবজারভেটরির নির্বাহী পরিচালক ও শহরের সাবেক কর্মকর্তা রশীদ সিদাত জানান, সরবরাহ ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা সহজেই ঘুষ গ্রহণ করেন। ২০০ র্যান্ডের ট্রাফিক ঘুষ থেকে শুরু করে ২০০ মিলিয়ন র্যান্ডের টেন্ডার পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাতেই দুর্নীতি মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেছে।

রাজনৈতিক ময়দানে মূল বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক অ্যালিয়েন্স (ডিএ) ক্ষমতাসীন এএনসি এবং তাদের জোটসঙ্গী ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইটারস (ইএফএফ) ও প্যাট্রিওটিক অ্যালিয়েন্সকে ক্ষমতাচ্যুত করতে জোহানেসবার্গে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। ৭৫ বছর বয়সী কেপটাউনের সাবেক মেয়র হেলেন জিলের নেতৃত্বে এই প্রচারণা পরিচালিত হচ্ছে। শ্বেতাঙ্গ জিল ২০১৭ সালে 'উপনিবেশবাদ পুরোপুরি ক্ষতিকর ছিল না' মর্মে মন্তব্য করে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। তবে এবার খানাখন্দে ভরা বিশাল গর্তে স্নোরকেলিং করার মতো ভাইরাল স্টান্ট দিয়ে নগরীর অবকাঠামোগত সমস্যা ফুটিয়ে তুলে তিনি জনমত জরিপে ডিএকে এগিয়ে রেখেছেন। অক্টোবরের জরিপে দেখা গেছে, ডিএ ২৯ থেকে ৩৬ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছে, যেখানে অন্তর্দলীয় কোন্দলে জর্জরিত এএনসি পাচ্ছে ২২ থেকে ২৭ শতাংশ সমর্থন।

তবে জরিপে এগিয়ে থাকলেও ডিএ একাই সরকার গঠন করতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। আফ্রিকা প্র্যাকটিস পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জিয়ান্দা স্তুরমান জানান, জোহানেসবার্গের রাজনৈতিক সমীকরণ বুঝতে পুরো খাউতেং প্রদেশের প্রেক্ষাপট দেখতে হবে। গত এক দশকে, বিশেষ করে ২০২১ সাল থেকে জোহানেসবার্গ, শোয়ানে ও একুরহুলেনি—এই তিন পৌরসভায় এএনসি, ইএফএফ এবং অ্যাকশনএসএ-এর মধ্যে একটি যৌথ বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে নীতির চেয়ে পদ বাণিজ্যের পাল্লাই ভারী হওয়ায় পুনরায় এমন জোট গঠিত হলে জোহানেসবার্গে অবকাঠামোগত অবক্ষয় আরও পাঁচ বছর স্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

শিরোনাম :
লাল বলে আয়ুশ বাদোনির টানা দ্বিশতক: ‘বেবি এবি’র ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প মধ্যবর্তী নির্বাচন, ভোটের দাবি ও পারিবারিক হুমকি নিয়ে মুখ খুললেন গভর্নর জোশ শাপিরো ফ্লোরিডায় প্রাইভেট জেট বিধ্বস্ত, নিহত ৯ লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের বাইরে বিক্ষোভে কয়েক ডজন ফিলিস্তিন সমর্থক গ্রেপ্তার সম্পূরক পরীক্ষায় পাস করেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা শিবম দুবেকে একদম বাদ দিলে অবাক হব: আকাশ চোপড়া ১৬ বছর পর সেরি আ-র শীর্ষে লাৎসিও, নেপোলিকে টপকাল ইউভেন্তুস ফ্রান্সে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি জোহানেসবার্গে নাগরিক সেবায় ধস: স্থানীয় নির্বাচনে চাপের মুখে এএনসি বন্ডি বিচে হামলার পর সিডনির রাস্তায় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশের টহল লাল বলে আয়ুশ বাদোনির টানা দ্বিশতক: ‘বেবি এবি’র ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প মধ্যবর্তী নির্বাচন, ভোটের দাবি ও পারিবারিক হুমকি নিয়ে মুখ খুললেন গভর্নর জোশ শাপিরো ফ্লোরিডায় প্রাইভেট জেট বিধ্বস্ত, নিহত ৯ লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের বাইরে বিক্ষোভে কয়েক ডজন ফিলিস্তিন সমর্থক গ্রেপ্তার সম্পূরক পরীক্ষায় পাস করেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা শিবম দুবেকে একদম বাদ দিলে অবাক হব: আকাশ চোপড়া ১৬ বছর পর সেরি আ-র শীর্ষে লাৎসিও, নেপোলিকে টপকাল ইউভেন্তুস ফ্রান্সে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি জোহানেসবার্গে নাগরিক সেবায় ধস: স্থানীয় নির্বাচনে চাপের মুখে এএনসি বন্ডি বিচে হামলার পর সিডনির রাস্তায় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশের টহল