যুক্তরাজ্যের সাবেক উপনিবেশগুলোর সঙ্গে একটি "কাঠামোগত সংলাপে" (structured dialogue) বসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহাম, যা দাসপ্রথার জন্য দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রার্থনার রূপরেখা তৈরি করবে। এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্য এমন একটি পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা নেদারল্যান্ডস প্রায় পাঁচ বছর আগে শুরু করেছিল। রাজপরিবারের সঙ্গে যৌথভাবে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। চলতি সপ্তাহে রাজা তৃতীয় চার্লস দাসপ্রথার জন্য তার "গভীর ব্যক্তিগত দুঃখ" পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যদিও এটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় ক্ষমার সমতুল্য নয়। লন্ডন প্রশাসন তাদের বক্তব্য ও শব্দচয়ন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলেও সরাসরি কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ (reparations) দেওয়ার বিষয়টি আগেই পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা নির্দেশ করে যে কেবল ক্ষমা চাইলেই অতীত ইতিহাস পুরোপুরি মুছে যায় না। ডাচ সরকারের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা একদিকে যেমন রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল, অন্যদিকে দাসপ্রথায় নিপীড়িতদের বংশধরদের মধ্যে হতাশা এবং প্রকৃত বিচার কী—তা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। অবশ্য ক্ষমা চাওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল বলে মনে করেন 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ডাচ স্লেভারি অ্যান্ড ইটস লেগাসি' (NiNsee)-এর তৎকালীন চেয়ারপারসন লিন্ডা নোইটমির। তিনি জানান, ডাচ সরকারের ক্ষমা চাওয়ার ভাষা ও অঙ্গভঙ্গিতে আন্তরিকতা অনুভব করা গিয়েছিল, যা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের হৃত মানবতা ফিরিয়ে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া ছিল। তবে বাস্তবে আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের অধিকার ও মূলগত পরিবর্তনের প্রশ্নে পরিস্থিতি ভিন্ন।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ডাচ তথাকথিত 'স্বর্ণযুগ'-এর ব্যবসায়ীরা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে সুরিনাম ও কিউরাসাওয়ের নির্মম বাগানে আনুমানিক ৬ লাখ আফ্রিকানকে পাচার করেছিল। এ ছাড়া ভারত মহাসাগর ও ইস্ট ইন্ডিজ অঞ্চলে আরও ৬ লাখ থেকে ১০ লাখ মানুষকে দাস হিসেবে কেনাবেচা করা হয়। ১৭৭০-এর দশকের মধ্যে দাসপ্রথানির্ভর সম্পদ থেকে পাওয়া আয় নেদারল্যান্ডসের হোল্যান্ড প্রদেশের জিডিপির ১০ শতাংশেরও বেশি গঠন করেছিল। এই বাণিজ্য থেকে ডাচ রাজপরিবারও বিপুল লাভবান হয়েছিল; ১৬৭৫ থেকে ১৭৭০ সালের মধ্যে দ্বিতীয় উইলিয়াম, চতুর্থ উইলিয়াম এবং পঞ্চম উইলিয়াম আধুনিক মূল্যে প্রায় ৫৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো (৪৬ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড) আয় করেছিলেন।
দাসপ্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মধ্যে নেদারল্যান্ডস অন্যতম দীর্ঘ সময় নিয়েছিল। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের যথাক্রমে ৩০ ও ১৫ বছর পর ১৮৬৩ সালের ১ জুলাই সুরিনাম ও ডাচ ক্যারিবীয় অঞ্চলে দাসপ্রথা আইনিভাবে রহিত করা হয়। তবে বাস্তবে দাসেদের প্রকৃত মুক্তি আসে ১৮৭৩ সালে। ১৯৮০-র দশকে আফ্রো-সুরিনামী ও আফ্রো-ক্যারিবীয় সম্প্রদায়ের আন্দোলনকারীরা এই নির্যাতনের দায়বদ্ধতার দাবি তোলেন। পরবর্তীতে ২০০২ সালে NiNsee প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০৬ সালে পাঠ্যক্রমে দাসপ্রথার ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্বব্যাপী গড়ে ওঠা বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন ডাচ রাজনীতিতে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। আন্দোলনকারী প্যাট্রিক ম্যাথুরিন তখন বলেছিলেন, তাদের আন্দোলনের মাধ্যমেই সমাজ এই ইতিহাসের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়েছে।
২০২১ সালের ১ জুলাই বাৎসরিক 'কেটি কোটি' (শৃঙ্খল ভাঙার উৎসব) উদযাপনের সময় আমস্টারডামের মেয়র ফেমকে হালসেমা আমস্টারডাম পৌরসভার পক্ষে প্রথম সরাসরি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি স্বীকার করেন যে শহরের অতীত বিপুল সম্পদ ও বাণিজ্যিক সাফল্য বর্ণবাদের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত ছিল, যা আজও সমাজে রয়ে গেছে। এরপর রটারডাম, ইউট্রেখট, দ্য হেগ এবং ডাচ সেন্ট্রাল ব্যাংকও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়। প্রথমে জাতীয় ক্ষমা প্রার্থনা সমাজকে বিভক্ত করবে বলে মনে করলেও তৎকালীন ডাচ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট তার অবস্থান থেকে সরে আসেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ডাচ ন্যাশনাল আর্কাইভে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে রুট দাসপ্রথাকে "মানবতাবিরোধী অপরাধ" হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং ২৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাচ রাষ্ট্রের এই প্রক্রিয়ায় সমর্থন ও সুবিধা নেওয়ার কথা স্বীকার করে বিশ্বজুড়ে দাসত্ব ভোগ করা সব মানুষ ও তাদের বংশধরদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান।
পরের বছর ২০২৩ সালের ১ জুলাই আমস্টারডামের ওস্টারপার্কে ডাচ রাজা উইলেম-অ্যালকজান্ডার ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন, রাজা ও সরকারের সদস্য হিসেবে তিনি নিজের অন্তরের গভীর থেকে এই ক্ষমা চাইছেন। তবে এরপরেও অ্যাক্টিভিস্ট ও বংশধরদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। 'অনার অ্যান্ড রিকভারি ফাউন্ডেশন'-এর রয় কাইকুসি গ্রোনবার্গ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাটিকে একটি "নব্য-ঔপনিবেশিক আস্ফালন" বলে আখ্যা দেন। ক্যারিবীয় চিন্তাবিদরা অভিযোগ করেন যে ইউরোপীয় রাজনীতিকরাই পুনর্মিলনের শর্ত ও সময়সীমা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন, যেখানে ভুক্তভোগীদের সাথে প্রকৃত আলোচনা করা হয়নি।
যদিও ডাচ সরকার কোনো ব্যক্তি বা সাবেক উপনিবেশকে সরাসরি আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল, তবে ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি ২০ কোটি ইউরোর একটি তহবিল গঠন ও একটি জাতীয় দাসপ্রথা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই তহবিলের অর্থ পাঠ্যক্রম সংস্কার, ঐতিহাসিক গবেষণা, ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং তৃণমূল সামাজিক উদ্যোগে ভাগ করে দেওয়া হয়। তবে অর্থনৈতিক উদ্যোগভিত্তিক সংস্থা 'ডিনি' (Deeeni)-এর প্রতিষ্ঠাতা লিন্ডা নোইটমির সতর্ক করে বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মূল সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত না করলে বৈষম্যের পুরোনো কাঠামো বহাল থেকেই যায়। তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষমার অর্থ যদি কেবল কথায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা একবিংশ শতাব্দীর "আয়না ও ক্রিস্টাল"-এর মতো ফাঁকা বস্তুতে পরিণত হবে—যেসব জিনিস দিয়ে অতীতে দাসদের কেনাবেচা করা হতো।
ডাচ সমাজে ক্ষমা প্রার্থনার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও ছিল তীব্র। ইপসোস আইঅ্যান্ডও-এর গবেষক জোয়ার্ড ভ্যান হেক জানান, ২০২১ সালে মাত্র ৩১ শতাংশ ডাচ জনগণ ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে ছিলেন, বিপরীতে ৫৫ শতাংশ এটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ২০২২ এবং ২০২৩ সালে ক্ষমা চাওয়ার পর সমর্থন কিছুটা বেড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছালেও ৪৬ শতাংশ মানুষ এর বিরুদ্ধে থেকে যান। জনগণের এই তীব্র বিভাজন উগ্র ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর পালে হাওয়া দেয়। ফ্রিডম পার্টির নেতা খিয়ার্ট ভিল্ডার্স রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রার্থনার তীব্র সমালোচনা করেন এবং শিক্ষাক্রম বদলে দেশের সাফল্য তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের নির্বাচনে তার দল অঘটন ঘটিয়ে অভাবনীয় জয় লাভ করে।
সুরিনামী, ক্যারিবীয় ও ডাচ সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে আমস্টারডাম সিটি হল ও জাতীয় সরকারের ৮ কোটি ইউরো অর্থায়নে নির্মিত জাতীয় দাসপ্রথা জাদুঘরটি ২০ ৩০ সালে উদ্বোধনের কথা রয়েছে। তবে যুক্তরাজ্যের জন্য নেদারল্যান্ডসের এই পুরো অভিজ্ঞতা একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: দাসপ্রথার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রার্থনা অতীত ইতিহাসের অধ্যায় বন্ধ করে দেয় না, বরং এটি ঔপনিবেশিক ইতিহাস পর্যালোচনার একটি নতুন এবং চরম বিতর্কিত অধ্যায়ের সূচনা করে।

