মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নজিরবিহীন পদক্ষেপকে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়ান-ভের্নার মুলার। তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্বার্থে বিজ্ঞানকে অবদমিত করার এই প্রক্রিয়াটি মার্কিন সফট পাওয়ার এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর বড় ধরনের আঘাত, যা কেবল গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের পরিপন্থীই নয়, বরং স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই আক্রমণ এখন বিদেশি শিক্ষার্থী এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে 'প্রজেক্ট ২০২৫'-এর সাথে যুক্ত এবং অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেটের পরিচালক রাসেল ভট একটি নতুন নিয়ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। এই নিয়মের অধীনে যেকোনো ফেডারেল অনুদান রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের পর্যালোচনার অধীন হবে। এর আগে এই অনুদানগুলো প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হতো। সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ট্রাম্পপন্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাষ্ট্রপতির অগ্রাধিকারের সাথে তাল মেলাতে বাধ্য করার জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক অস্ত্র হাতে পাবে।
ট্রাম্পের বিজ্ঞান উপদেষ্টা মাইকেল ক্রাতসিওস, যিনি আগে পিটার থিয়েলের অধীনে কর্মরত ছিলেন এবং গবেষণার ক্ষেত্রে যাঁর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেসরকারি কর্পোরেশনের হাতে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক সাফল্যগুলো চিহ্নিত করতে পারবে বলে তিনি দাবি করেন। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুসৃত সফল বিজ্ঞান নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। এতদিন মার্কিন সরকার করদাতাদের অর্থ এমন মৌলিক গবেষণায় ব্যয় করত যা কোনো বেসরকারি কোম্পানি ঝুঁকি নিয়ে স্পনসর করতে চাইত না, অথচ দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পেত দেশের জনগণ ও পুঁজিপতিরা। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পপন্থীদের রাজনৈতিক শত্রু হিসেবে বিবেচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তহবিল কেটে তাদের প্রযুক্তি খাতের মিত্রদের কাছে হস্তান্তরের এটি একটি সূক্ষ্ম কৌশল।
স্টিফেন মিলারের কট্টর জাতীয়তাবাদী নীতির ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অনুদানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। পিএইচডি শিক্ষার্থীদের ভিসার মেয়াদ এখন মাত্র চার বছরে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে, যা অনেক বিষয়ের গবেষণার জন্য অত্যন্ত অবাস্তব একটি সময়সীমা। ভিসার মেয়াদ বাড়াতে হলে শিক্ষার্থীদের এখন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের কাছে আবেদন করতে হবে, যা তাদের মূল গবেষণা থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। অতীতে অনেক গবেষক পিএইচডি শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যেতেন এবং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অবদান রাখতেন, যা ট্রাম্পপন্থীদের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বর্তমান নীতিতে এই বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষার প্রতি ডানপন্থীদের এই বৈরিতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। ১৯৫০-এর দশকে বুদ্ধিজীবীদের কমিউনিস্ট আখ্যা দেওয়া থেকে শুরু করে ১৯৯০-এর দশকের 'পলিটিক্যাল কারেক্টনেস' এবং সাম্প্রতিক সময়ের 'ওকনেস' নিয়ে নৈতিক আতঙ্ক তৈরির ধারাবাহিকতা এটি। ২০২১ সালে জেডি ভ্যান্স সরাসরি বলেছিলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের শত্রু।" ট্রাম্পের শাসনামলে এমন একটি নতুন জোট তৈরি হয়েছে যারা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে একতাবদ্ধ। এই জোটে রয়েছে কট্টর 'মাগা' (MAGA) গোষ্ঠী, সিলিকন ভ্যালির অলিগার্করা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ব্যবসা করতে চায়, এবং এমন কিছু উগ্র রক্ষণশীল যারা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হলে তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে চায়।

