জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন রাজশাহীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) অভিযোগপত্র নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে ৩৮ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, স্থানীয়ভাবে আলোচিত বেশ কয়েকজন ব্যক্তির নাম বাদ পড়ায় আন্দোলনকারী ও সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় আন্দোলনকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী, অভিযোগপত্রে সাবেক এমপি শফিকুর রহমান বাদশা ও ফজলে হোসেন বাদশা, সাবেক কাউন্সিলর তরিকুল আলম পল্টু, যুবলীগের রাজশাহী মহানগরীর সাবেক সভাপতি রমজান আলী, বোয়ালিয়া থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিকুর রহমান কালু এবং নগর আওয়ামী লীগের নেতা মীর ইস্তিয়াক আহম্মেদ লেমনের মতো আলোচিতদের নাম নেই। বিশেষ করে তালাইমারীর সাবেক কাউন্সিলর তরিকুল আলম পল্টুর নাম না থাকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিস্ময় ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তরিকুল আলম পল্টু বর্তমানে আলী রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে কারাগারে থাকলেও, ট্রাইব্যুনালের তালিকায় তাকে অন্তর্ভুক্ত না করায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
তালাইমারী এলাকার বাসিন্দা আক্তারুজ্জামান টেনি অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের সময় অস্ত্র হাতে পল্টুকে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় দেখা গেছে, যার ভিডিও ফুটেজও সংরক্ষিত আছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, কারাগারে থেকেও পল্টু তার পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে আসন্ন রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছেন।
গত ৩০ জুলাই ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে দাখিল করা এই অভিযোগপত্রে রাসিকের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের তথ্যমতে, ৫ আগস্ট বোয়ালিয়া থানার শেখেরচক এলাকার লবঙ্গ রেস্টুরেন্টের সামনে রায়হান আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং একই দিনে শাহ মখদুম কলেজের সামনে আনজুম সাকিব নিহত হন। এছাড়া সালমান ওরফে শিমুলসহ অন্তত ৪৫ জন আহত হন।
অভিযোগপত্রের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী অয়ন বলেন, প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো আওয়ামী লীগ নেতা তরিকুল আলম পল্টু ও তার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বাদ দেওয়া জুলাইযোদ্ধাদের জন্য হতাশাজনক। রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক সেক্রেটারি জসিম উদ্দিন সরকার এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজশাহী মহানগরের আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলীও একই সুর মিলিয়েছেন। মোবাশ্বের আলী জানান, ভিডিও ফুটেজে যাদের সরাসরি আক্রমণাত্মক ভূমিকা দেখা গেছে, তাদের বাদ দেওয়া জুলাই আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থী। তিনি অভিযোগপত্রটি পুনরায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে সম্পূরক অভিযোগ বা আইনানুগ অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, পরবর্তীতে তদন্তে নতুন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে যে কারো নাম সংযুক্ত করা সম্ভব।

