পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক আজহার আলী দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোয় ডিপার্টমেন্টাল (বিভাগীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক) দলগুলোর পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন। তাঁর মতে, এই বিভাগীয় ক্রিকেটই ছিল পাকিস্তান ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ‘নার্সারি’। ক্রিকইনফোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আজহার দাবি করেছেন, পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটের সাম্প্রতিক বিপর্যয় এবং নতুন প্রতিভার অভাব সরাসরি ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকে ডিপার্টমেন্টাল দলগুলোকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত।
সম্প্রতি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) নতুন নিয়ম এবং অংশগ্রহণ ফি তিন গুণ বাড়ানোর কারণে ২টি বড় ডিপার্টমেন্টাল দলকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যতম প্রাচীন দল এবং প্রথম শ্রেণির প্রতিযোগিতার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ওয়াপদা (WAPDA)। এছাড়া সাহির অ্যাসোসিয়েটসও নতুন শর্ত মেনে না নিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, আজহার আলীর সাবেক দল খান রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ (কেআরএল) প্রথমে নাম প্রত্যাহারের কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে সই করেছে। এবার কায়েদ-ই-আজম ট্রফির ফরম্যাটে বড় পরিবর্তন এনে ১০টি আঞ্চলিক দল রাখা হয়েছে এবং ডিপার্টমেন্টগুলোর জন্য কঠিন আর্থিক শর্তারোপ করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোও তাদের প্রথম শ্রেণির কাঠামোয় ডিপার্টমেন্টাল ক্রিকেটকে যুক্ত করলেও, পাকিস্তানে যেভাবে বাণিজ্যিক ডিপার্টমেন্টগুলো পরিচালিত হয়েছে তা অনন্য। ১৯৫৩-৫৪ মৌসুমে কায়েদ-ই-আজম ট্রফির উদ্বোধনী আসর থেকেই ডিপার্টমেন্টাল দলগুলো পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটের অংশ হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশক থেকে এই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়, যা প্রায় ২০টিরও বেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে এবং ক্রিকেটারদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসছে।
ঘরোয়া কাঠামোর এই ঘনঘন পরিবর্তনকে কঠোর সমালোচনা করে আজহার বলেন, কোনো পদ্ধতি চালু করার পর সেটিকে অন্তত কয়েক বছর সময় দেওয়া উচিত। প্রতি বছর পরিবর্তন করার অর্থ হলো আগের সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের উদ্যোগে ডিপার্টমেন্টাল ক্রিকেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালে আজহারসহ কয়েকজন ক্রিকেটার ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অনুরোধ করলেও তারা সফল হননি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আবার ডিপার্টমেন্টগুলো ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে আসে। কিন্তু নতুন নিয়মের বেড়াজালে আবারও সেগুলোকে কোণঠাসা করা হচ্ছে বলে আজহার মনে করেন।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ডিপার্টমেন্টাল ক্রিকেটের গুরুত্ব তুলে ধরে আজহার বলেন, তিনি নিজে এই ডিপার্টমেন্টাল ক্রিকেটের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছেন। এক সময় আঞ্চলিক দলগুলো ক্রিকেটারদের কোনো পাত্তাই দিত না, কিন্তু ডিপার্টমেন্টগুলো তাদের বেতন ও আর্থিক নিরাপত্তা দিয়েছিল। তিনি আরও যোগ করেন, ছোট ডিপার্টমেন্ট বা দ্বিতীয় স্তরের দলগুলো যে ৩০,০০০-৪০,০০০ রুপি দেয়, সেটিও পাকিস্তানের বাস্তবতায় তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য অনেক বড় বিষয়। আর্থিক নিরাপত্তা না থাকলে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ক্রিকেট খেলতে দেবেন না, বরং চাকরি খুঁজতে বলবেন। ২০১৯ সালে এই ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার পর অনেক তরুণ ক্রিকেটার ভবিষ্যৎ না দেখে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন বলেও তিনি জানান।
পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটের করুণ দশার কথা উল্লেখ করে আজহার বলেন, ঘরোয়া ক্রিকেটে অভিজ্ঞ ও তরুণদের মেলবন্ধন নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে পাকিস্তান দল তাদের শেষ ১৮টি টেস্টের মধ্যে ১৩টিতেই হেরেছে এবং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিকারশিপের পয়েন্ট তালিকায় ৯টি দলের মধ্যে অষ্টম স্থানে রয়েছে। আজহার বলেন, ঘরোয়া ক্রিকেটে এখন শুধু তরুণ ক্রিকেটাররাই খেলছে। মাঠে একজন অভিজ্ঞ বোলার বা ব্যাটসম্যান থাকলে তরুণরা তাদের কাছ থেকে খেলা চলাকালীন অনেক কিছু শিখতে পারে। শুধু কোচ দিয়ে সব শেখানো সম্ভব নয়, মাঠের ভেতর অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমর্থন জরুরি।

