তুরস্ক ও সৌদি আরব তাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত করতে যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আরও ৩,০০০ মেগাওয়াটের একটি চুক্তি সম্পন্ন হতে চলেছে, যার ফলে তুরস্কে পরিকল্পিত যৌথ প্রকল্পের মোট সক্ষমতা দাঁড়াবে ৫,০০০ মেগাওয়াটে। তুরস্কের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রী আলপারসলান বায়ারাকতার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। শনিবার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বায়ারাকতার জানান, এর আগে দুই দেশের মধ্যে ২,০০০ মেগাওয়াটের একটি চুক্তি সই হয়েছিল। এবার অ্যান্টালিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের (UN Climate Conference) সাইডলাইনে নতুন এই ৩,০০০ মেগাওয়াটের চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হবে।
বিগত ২৫ বছরে তুরস্কের জ্বালানি ও খনি খাতের অভূতপূর্ব অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে দেশটিতে প্রায় এক শতাব্দীর সমপরিমাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই সময়ে তুরস্কের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা চার গুণ বেড়ে ৩২,০০০ মেগাওয়াট থেকে ১,২৬,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে, যার মধ্যে গত ২৪ বছরেই নতুন করে প্রায় ৯৫,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। বায়ারাকতার জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের দিক থেকে ফ্রান্স ও জার্মানির পর তুরস্ক এখন ইউরোপে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এই সময়ে দেশের তেল উৎপাদন তিন গুণ, প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন নয় গুণ এবং খনিজ রপ্তানি দশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। 'তুরস্কের শতাব্দী' (Century of Türkiye) ভিশনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমাদের একটি মৌলিক লক্ষ্য রয়েছে: 'তুরস্কের শতাব্দী' ভিশনের অধীনে তুরস্ককে জ্বালানি খাতে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা। এটিই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।"
গ্যাস ও তেল উৎপাদনের বিবরণ দিয়ে মন্ত্রী জানান, ২০০২ সালে যেখানে মাত্র ৫টি প্রদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ছিল, এখন তা দেশের সবকটি (৮১টি) প্রদেশে পৌঁছেছে। চলতি বছর দেশটিতে ১,০০০তম জনবসতিতে গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্পন্ন হবে। কৃষ্ণসাগরে নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন এ বছর দ্বিগুণ এবং ২০২৮ সালের মধ্যে চার গুণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ পরিবারের গ্যাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের গাবার তেলক্ষেত্র থেকে দৈনিক উৎপাদন ৮৩,০০০ ব্যারেল ছাড়িয়েছে, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দাসহ ৩,৫০০-এর বেশি মানুষ কর্মরত আছেন। বায়ারাকতারের মতে, "গাবার অঞ্চলটি সন্ত্রাসমুক্ত তুরস্ক কেমন হতে পারে তার একটি বাস্তব উদাহরণ।" সন্ত্রাস দমনের পর এই তেল উৎপাদন ওই অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান বাড়াচ্ছে এবং দেশের জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমাচ্ছে। পাশাপাশি দিয়ারবাকিরেও অপ্রচলিত তেল অনুসন্ধানের কাজ চলছে, যার উৎপাদন সম্ভাবনা গাবারের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি হতে পারে। সফল হলে সেখানে শত শত কূপ খনন করা হবে। বর্তমানে প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে অনুসন্ধান চললেও এর সম্ভাব্য পরিধি ৭,২০০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
হরমুজ প্রণালী সংকটের কারণে উদ্ভূত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এই পরিস্থিতি জ্বালানি রুট বহুমুখীকরণের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী ফালিহ আল-জাইদির সাম্প্রতিক তুরস্ক সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইরাকি তেলের একটি বড় অংশ তুরস্ক ও জেইহান টার্মিনালের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া সৌদি আরব, জর্ডান ও সিরিয়া হয়ে কাতারের গ্যাস তুরস্ক এবং পরবর্তীতে ইউরোপে পাঠানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কুয়েতি তেল তুরস্কে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের স্থল ও জলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করছে তুরস্ক। আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে তুরস্কের সিসমিক গবেষণা জাহাজ ‘ওরুচ রেইস’ পাকিস্তানে যাবে এবং খনি প্রকল্পে অংশীদারিত্বের বিষয়ে আলোচনা করতে বায়ারাকতার নিজেই শিগগিরই পাকিস্তান সফর করবেন।

