ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার জেরে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অথচ এর মধ্যেই রাষ্ট্রীয়ভাবে ধুমধাম করে উদ্যাপিত হচ্ছে ‘রুশ পতাকা দিবস’। একদিকে জ্বালানির জন্য হাহাকার, অন্যদিকে দেশপ্রেমের প্রদর্শন—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন রাশিয়ার নাগরিকরা।
মস্কোর দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের একটি পেট্রোল পাম্পে গাড়িতে বসে দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে অপেক্ষা করছিলেন সভিয়াতোস্লাভ নামের এক ব্যক্তি। কিন্তু হঠাৎ করেই পাম্পের সাইনবোর্ড বদলে গিয়ে লেখা ওঠে ‘জ্বালানি নেই’। সভিয়াতোস্লাভ তবুও আশাবাদী, তিনি বলেন, "তারা বলছে এখানে পেট্রোল পাওয়া যাবে। তবে কখন পাওয়া যাবে তা তারা নিশ্চিত নয়। হয়তো আজ, নয়তো আগামীকাল।" অন্য কোথাও যাওয়ার মতো জ্বালানিও তার গাড়ির ট্যাংকে অবশিষ্ট নেই। শুধু সভিয়াতোস্লাভ একাই নন, মস্কোর প্রায় সব পেট্রোল পাম্পেই এখন গাড়ির দীর্ঘ সারি। কোনো কোনো পাম্পের সামনে ৮০টিরও বেশি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
রুশ কর্মকর্তারা এই সংকটের পেছনে তেল শোধনাগারগুলোর "অপ্রত্যাশিত সংস্কার কাজকে" দায়ী করছেন। তবে মূলত ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলার কারণেই এই শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সংস্কার করতে হচ্ছে। চলতি গ্রীষ্মের শুরুর দিকেও একই ধরনের ড্রোন হামলায় দেশটিতে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল। এবার সংকটের তীব্রতা আরও বেশি এবং কর্তৃপক্ষ শোধন ক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা সমাধানে হিমশিম খাচ্ছে। রাশিয়ার জাতীয় দৈনিক ‘নেজাভিসিমায়া গেজেটা’ এই পরিস্থিতিকে "জ্বালানি সংকটের দ্বিতীয় তরঙ্গ" হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
জ্বালানির এই তীব্র সংকট এখন রুশ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলিজাবেথ নামের এক ভুক্তভোগী জানান, আগের দিন রাত ১১টায় লাইনে দাঁড়িয়ে রাত ১২টায় যখন তিনি পাম্পের সামনে পৌঁছান, ঠিক তখনই পাম্পটি রাত ২টা পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। মফস্বল থেকে মস্কোয় গাড়ি চালিয়ে আসা লিউবভ নামের আরেক নারী জানান, পুরো পথেই তিনি একটি পাম্পেও পেট্রোল পাননি। লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের পোষা কুকুর ‘আগাথা’কে আদর করে শান্ত থাকার চেষ্টা করছিলেন তিনি। এই সংকট নিয়ে তিনি বলেন, "সবাই বলছে দেশের পরিস্থিতি এখন কঠিন এবং সবাই এই সংকটকে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গেই মেলাচ্ছে।"
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর আগে দেশটির অভ্যন্তরে কোনো ড্রোন হামলা হয়নি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাশিয়াকে এখন পেট্রোল আমদানি করতে হচ্ছে, যা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক ও জ্বালানি পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত একটি দেশের জন্য অত্যন্ত নজিরবিহীন। রাশিয়ার সরকারি সংবাদপত্র ‘রসিস্কায়া গেজেটা’ সতর্ক করে লিখেছে, আধুনিক গাড়িগুলোতে নিম্নমানের পেট্রোল (যেমন ইউরো ২) নিয়মিত ব্যবহার করলে তা ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। শুধু তেল শোধনাগারই নয়, রাশিয়ার আমাজন হিসেবে পরিচিত ‘ওয়াইল্ডবেরিজ’-এর বিতরণ কেন্দ্রেও ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্বীকার করেছেন যে, শিল্প ও অবকাঠামোতে এসব হামলা ক্ষতি সাধন করছে। তবে তিনি এই সংকটের গুরুত্ব কমিয়ে দেখাতে গিয়ে বলেন, "এসব হামলার কোনো মারাত্মক বা সংকটজনক পরিণতি নেই এবং তা হতেও পারে না।" তবে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ‘নোভায়া গেজেটা’-র কলামিস্ট আন্দ্রেই কোলেসনিকভ মনে করেন, পুতিনের দাবির সঙ্গে জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতার বড় অমিল রয়েছে। তিনি বলেন, "পুতিন হয়তো নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু বর্তমানে মানুষের মনে তীব্র উদ্বেগ কাজ করছে।" জরিপ সংস্থা ‘পাবলিক ওপিনিয়ন ফাউন্ডেশন’-এর সাম্প্রতিক জরিপেও দেখা গেছে, রুশ সমাজে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে।
পেট্রোল পাম্পের এই দীর্ঘ লাইনের কয়েক মিনিট দূরত্বের মধ্যেই আবার দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে রুশ পতাকা দিবস উপলক্ষে স্থানীয় প্রশাসন গান-বাজনা ও মেলার আয়োজন করেছে। সেখানে জ্বালানির সংকট থাকলেও দেশপ্রেমের কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। লাউডস্পিকারে বাজছে দেশাত্মবোধক গান, আর স্বেচ্ছাসেবীরা মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন রাশিয়ার ত্রিবর্ণ রঞ্জিত জাতীয় পতাকা। মেলার এক কোণে ক্যান্ডিফ্লসের পাশাপাশি সাজিয়ে রাখা হয়েছে কালাশনিকভ রাইফেল ও রকেট লঞ্চারের মতো সামরিক অস্ত্রশস্ত্র। শিশুরা সেসব অস্ত্র হাতে নিয়ে ছবি তুলছে, যা রুশ সমাজের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণেরই ইঙ্গিত দেয়।
এই দেশপ্রেমের প্রদর্শনী অনেকের মনে সাহস জোগাচ্ছে। তাতিয়ানা নামের এক অবসরপ্রাপ্ত নারী বলেন, "কঠিন পরিস্থিতি আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে। পরিস্থিতি যত কঠিন হবে, আমরা তত শক্তিশালী হব।" কিন্তু যুদ্ধ ও ড্রোন হামলার আতঙ্ক সাধারণ মানুষের মন থেকে দূর হচ্ছে না। অ্যাঞ্জেলিনা নামের এক তরুণী বলেন, "রাতে যখন ঘুমাতে যাই, সকালে জীবিত জেগে উঠব কি না তা জানি না। এটাই এখন একমাত্র সমস্যা, বাকি সব ঠিক আছে।" আরেক নারী জানান, আগের রাতে বিস্ফোরণের শব্দে তার ঘরের জানালা কেঁপে উঠেছিল। তিনি বলেন, "এখন নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যাতে যাই ঘটুক না কেন, নিজেকে শান্ত রাখা যায়।"

