ক্রিমিয়ার অধিকৃত বন্দর নগরী সেভাস্টোপলের একটি শান্ত আবাসিক এলাকায় গত ১৩ আগস্ট ভোরে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। রাস্তার পাশে একটি ডাস্টবিনে লুকিয়ে রাখা প্রায় ৫০০ গ্রাম টিএনটি সমমানের একটি বোমার বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই নিহত হন রবার্ট শাগিয়েভ। শাগিয়েভ ছিলেন রুশ কৃষ্ণসাগর নৌবহরের একটি সাবমেরিন ব্রিগেডের উপ-কমান্ডার এবং ইউক্রেনের একমাত্র সাবমেরিনের সাবেক কমান্ডার, যিনি ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর দল পরিবর্তন করে মস্কোর পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন।
এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রুশ তদন্তকারীরা মার্গারিটা রিউত নামের এক ৩২ বছর বয়সী নারীকে গ্রেপ্তার করে। মার্গারিটা কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী রুশ রিসোর্ট শহর সোচির বাসিন্দা। গ্রেপ্তারের পর তল্লাশি চালিয়ে তাঁর কাছ থেকে একটি রিমোট কন্ট্রোল উদ্ধার করার দাবি করে পুলিশ, যা দিয়ে শাগিয়েভকে হত্যার বোমাটি নিষ্ক্রিয় বা সক্রিয় করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এফএসবি) জানিয়েছে, মার্গারিটা তাঁর অপরাধ স্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক সমন্বয়ক তাঁকে বড় অঙ্কের ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং রাশিয়া ছাড়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এফএসবি আরও জানিয়েছে, মার্গারিটার মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। যদিও রুশ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর এমন স্বীকারোক্তি আদায়ের ইতিহাস রয়েছে এবং আদালতে যাওয়ার আগে এগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না।
মার্গারিটা রিউতের এই চরমপন্থী রূপান্তর তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধুদের জন্য এক বিরাট ধাক্কা হিসেবে এসেছে। শৈশবে মার্গারিটা ইয়াকোভলেভা নামে পরিচিত এই তরুণী বড় হয়েছেন মস্কোর উত্তর-পূর্বের শহর ইয়ারোস্লাভলে। বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি তাঁর নানীর কাছে বড় হন এবং তাঁরই পদবি 'রিউত' গ্রহণ করেন। মার্গারিটার বন্ধুরা তাঁকে অত্যন্ত হাসিখুশি ও মিশুক হিসেবে স্মরণ করলেও তাঁর মধ্যে সবসময়ই এক ধরনের রোমাঞ্চপ্রিয়তা ও ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা ছিল। ছোটবেলায় তিনি ছেলেদের মতোই গাছে চড়তেন বা গাড়ি থেকে লাফ দিতেন, যা অন্য অনেকে করতে ভয় পেত।
পরবর্তীতে হাজার মাইল পূর্বে নভোসিবিরস্কে পড়াশোনা করার সময় মার্গারিটা একটি স্থানীয় প্যারাশুটিং ক্লাবের নিয়মিত সদস্য হয়ে ওঠেন। সোভিয়েত আমলের বিমান থেকে প্যারাসুট নিয়ে ঝাঁপ দেওয়ার ছবিতে প্রায়শই সেনা পোশাক পরিহিত পুরুষদের মাঝে তাঁকে একমাত্র নারী হিসেবে দেখা যেত। এছাড়া তিনি অপেশাদার গো-কার্টিং প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটার পোলো দলের গোলরক্ষক হিসেবেও সুনাম কুড়িয়েছেন। মজার বিষয় হলো, সে সময় ক্রেমলিনের প্রতি তাঁর কোনো ক্ষোভের লক্ষণ ছিল না। নভোসিবিরস্কে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সোভিয়েত সৈন্যদের দেহাবশেষ খুঁজে বের করার একটি দেশপ্রেমিক স্বেচ্ছাসেবী দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে মার্গারিটা সোচিতে চলে যান। সেখানে কিছুদিন ট্রাভেল এজেন্সি চালানোর পর ২০২০-এর দশকের শুরুতে 'ভিটাউক্ট' নামের একটি বিকল্প ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা গেনাদি গারবুজভ মার্গারিটাকে অত্যন্ত সাধারণ এক নারী হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, তাঁর এমন আচরণ করার মতো কোনো লক্ষণই ছিল না। সম্ভবত তিনি কারও প্ররোচনায় এই কাজ করেছেন। ইন্টারনেটেও তাঁর জীবন ছিল খুব সাধারণ; তিনি স্বাস্থ্য, বন্যপ্রাণী অধিকার ও বিকল্প চিকিৎসা নিয়ে কথা বলতেন। এছাড়া তিনি থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা এবং কিউবার মতো দেশে ভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবি প্রকাশ করতেন।
তবে এই সাধারণ জীবনের আড়ালে মার্গারিটার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এক বড় পরিবর্তন আসছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কৃষ্ণসাগরে তেল বিপর্যয়ের পর তিনি সৈকত পরিষ্কারের স্বেচ্ছাসেবী কাজে যোগ দেন। বন্ধুদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার প্রতি তাঁর ক্ষোভ ও দূরত্ব বাড়তে থাকে। যুদ্ধ শুরুর ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে স্তব্ধ করেছিল এবং তিনি প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে একটি ট্রেনে ভ্রমণের সময় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার খবর শুনে রুশদের উদ্দেশ্যে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করায় রুশ সেনাবাহিনীর 'মর্যাদা ক্ষুণ্ন' করার অভিযোগে তাঁকে জরিমানাও করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি নিজের ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল শেয়ার করে একটি হ্যাশট্যাগ দিয়ে লেখেন যে, তিনি 'রুশ হিসেবে লজ্জিত'।
চলতি বছরের বসন্তকাল থেকে মার্গারিটার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন তাঁর পরিচিতরা। তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং একটি নতুন দ্বিতীয় ফোন ব্যবহার করা শুরু করেন, যার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তিনি বন্ধুদের দিতে পারেননি। গ্রীষ্মের দিকে তিনি মিউজিক ভিডিওর লোকেশন খোঁজার অজুহাতে ক্রিমিয়ায় যাতায়াত বাড়াতে থাকেন, যেখানে শেষ পর্যন্ত তিনি গ্রেপ্তার হন। ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের সাথে তাঁর যোগাযোগের সুনির্দিষ্ট সময় বা প্রক্রিয়া এখনও অজানা। তবে মার্গারিটার দুই দশকের এক বন্ধু বলেন, "রীতা যদি কোনো পরিকল্পনা মাথায় নিত, তবে তা সে করেই ছাড়ত—তা যতই কঠিন বা ভয়ানক হোক না কেন।"

