ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও সম্প্রসারণ করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন এই পদক্ষেপের জবাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চীন। একই সঙ্গে বেইজিং মার্কিন এই উদ্যোগকে "অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞা" বলে আখ্যায়িত করেছে এবং এর তীব্র বিরোধিতা করেছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর নতুন এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা জানান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের সঙ্গে যে দেশই আর্থিক অংশীদারিত্ব বজায় রাখবে, তাকেই আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হবে। বিশেষ করে ইরানের তেল ক্রয়ের প্রধান দেশ চীনকে লক্ষ্য করে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। খালেদা ব্যাংকগুলোর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট স্পষ্ট করে বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে কেউ নেই।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চীন ও ইরানের মধ্যকার সহযোগিতা সবসময় আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়ে আসছে এবং এতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা বিঘ্ন সৃষ্টি করা উচিত নয়। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ না করে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের ফোন করে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সুনির্দিষ্ট অনুরোধ জানাবেন।
আগামী মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে একটি পরিকল্পিত বৈঠকের ঠিক আগে এই নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের ঘোষণা এলো। তবে ওয়াশিংটনও বেইজিংয়ের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে সতর্ক থাকতে পারে। কারণ, বেইজিং বিশ্বের অধিকাংশ রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ উপাদান প্রক্রিয়াজাত করে, যা উচ্চ-প্রযুক্তি পণ্য তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার অংশ হিসেবে চীন রেয়ার আর্থ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছিল।
এদিকে ইরানের অর্থনীতি মন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, তেহরান এই বর্ধিত নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি দাবি করেন, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি পরাজয় ডেকে আনবে। মাদানিজাদেহ বলেন, সরকার প্রস্তুত রয়েছে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের দুই বছরের একটি পরিকল্পনা আছে। আমাদের নিজস্ব হাতিয়ার রয়েছে এবং আমরা জানি কীভাবে এই খেলা খেলতে হয়। তিনি আরও জানান, তেহরান দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করছিল।
ইরান যুদ্ধের প্রায় ছয় মাস পর এই নিষেধাজ্ঞা এলো। এই সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তেহরান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও নিজস্ব নৌবাহিনী দিয়ে সেখানে জাহাজ চলাচল ধীর করে দিয়েছে। সম্প্রতি কূটনীতির মাধ্যমে এই সংঘাত অবসানের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং গত সপ্তাহে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
নতুন এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, তারা এখন আর কেবল ইরানের হুমকি নিয়ন্ত্রণ করছেন না, বরং এটি চিরতরে শেষ করছেন। ইরানের তেল চোরাচালানের আর্থিক চ্যানেল এবং নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
তবে ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রধান জলবায়ু ও পণ্য অর্থনীতিবিদ ডেভিড অক্সলি বলেন, ইরানের জ্বালানি রাজস্বের ওপর এর প্রত্যক্ষ প্রভাব খুবই সীমিত হতে পারে। কারণ ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল যায় চীনে, যারা অতীতেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানেনি এবং এবারও বেইজিং পিছু হটবে বলে মনে হয় না।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর আলী ওয়ায়েজ বলেন, চীনারা সবসময় একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধী। বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে ওয়ায়েজ বলেন, যদিও পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইরাকের মতো ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে ‘ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সামর্থ্য তাদের নেই’। তিনি আরও বলেন, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে কাজ হয় না, কারণ ইরানি প্রশাসন যেকোনো কষ্ট সহ্য করে তা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে প্রস্তুত। এই নিষেধাজ্ঞায় ভারত ও রাশিয়াও প্রভাবিত হতে পারে, তবে তারা এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

