কানাডার শান্ত স্বভাবের প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী বক্তা হয়ে উঠবেন, তা হয়তো অনেকেই ভাবেননি। একজন সাবেক গোল্ডম্যান স্যাক্স নির্বাহী এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাবেক গভর্নর হিসেবে তিনি সাধারণত শান্ত ও গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠে কথা বলেন। তবে ২০২৬ সালে তার দেওয়া দুটি ভাষণ বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অভিষেকের প্রথম বার্ষিকীতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে প্রথম ভাষণটি দেন কার্নি। সেখানে তিনি বিশ্বব্যবস্থায় একটি বড় ফাটল এবং একটি মনোরম কল্পকাহিনীর অবসানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বজুড়ে শান্তি বজায় রাখা মার্কিন নেতৃত্বের ওপর কানাডা আর ভরসা করতে পারছে না। কার্নি এমন একটি নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের আহ্বান জানান, যেখানে সমমনা ও মাঝারি শক্তির দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করবে। এই জোটে ঐতিহ্যগতভাবে পশ্চিমাদের নেতৃত্ব দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কার্নি সতর্ক করে বলেন, আমরা যদি আলোচনার টেবিলে না থাকি, তবে আমরা অন্যের খাদ্য তালিকায় চলে যাব।
এর পর গত ২২ আগস্ট ওটাওয়ার একটি সাধারণ সরকারি কার্যালয় থেকে ২৩ মিনিটের আরেকটি ভাষণ দেন কার্নি। আটটি কানাডীয় পতাকা এবং একটি কাঠের তৈরি পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়া এই ভাষণটি ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্পের মতো। এই ভাষণে কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করার ঘোষণা দেন। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই কানাডার ওপর যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছিল। কার্নি অত্যন্ত শান্ত গলায় কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একমুখী নীতির কড়া সমালোচনা করেন।
কার্নির এই বক্তব্যের পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। ট্রাম্প কানাডার কর্মকর্তাদের ক্লাউন বা জোকার বলে উপহাস করেন, লেক ওন্টারিও-র নাম বদলে লেক আমেরিকা রাখার হুমকি দেন এবং কার্নিকে প্রধানমন্ত্রী না বলে গভর্নর বলে সম্বোধন করেন। এমনকি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার দাবিও তোলা হয়েছিল। ট্রাম্পের এমন আক্রমণাত্মক আচরণের বিপরীতে কার্নি অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে এবং তথ্যের ভিত্তিতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
কার্নি তার ভাষণে ইংরেজি ও ফরাসি উভয় ভাষায় অভিবাদন জানান, যা ফরাসি ভাষার ওপর মার্কিন চাপ প্রয়োগের চেষ্টার বিরুদ্ধে একটি সূক্ষ্ম জবাব ছিল। তিনি কিছু সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরে দেখান যে, দুই দেশের অর্থনীতি কতটা গভীরভাবে জড়িত। কানাডা যুক্তরাজ্য, জাপান ও চীনের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি মার্কিন গাড়ি কেনে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ৯৯ শতাংশই সরবরাহ করে কানাডা। ওয়াশিংটন থেকে ধেয়ে আসা ঝড় এবং মার্কিন প্রশাসনের খামখেয়ালি আচরণের কারণে কানাডা এখন বিশ্বমঞ্চে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বহুমুখীকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কার্নি মন্তব্য করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এখন পেনসিল দিয়ে লেখার মতো অস্থায়ী হয়ে গেছে।
ঐতিহাসিকভাবে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অত্যন্ত সুদৃঢ় সম্পর্ক ছিল। ১৯৫৮ সাল থেকে নোরাড (NORAD) চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ যৌথভাবে আকাশসীমা রক্ষা করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কানাডীয় পর্যটকদের যাতায়াত ২৫ শতাংশ কমে গেছে, যার প্রভাব মার্কিন ব্যবসায় পড়তে শুরু করেছে। মার্কিন আলোচকরা যেখানে স্বল্পমেয়াদি লেনদেনকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, কানাডা সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের পক্ষে। ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা বা ন্যাটোর ওপর ক্রমাগত আক্রমণের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার অন্যতম বিশ্বস্ত মিত্রকে হারাতে চলেছে।
ভাষণের শেষে কার্নি অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, কানাডা এখন আরও শক্তিশালী এবং আমেরিকার ওপর অনেক কম নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। তারা আমাদের যা কেড়ে নিতে পারে, তার চেয়ে বেশি আমরা নিজেদের গড়ে তুলছি। কানাডিয়ানরা আবহাওয়ার কাছে নতি স্বীকার করে না, বরং এর মধ্যেই নিজেদের বিকশিত করে। আমরা বাতাস কোন দিকে বইছে তার জন্য অপেক্ষা করি না, কিংবা ঝড়ের মুখে নিজেদের ভাসিয়ে দিই না। আমরা আমাদের নিজেদের পথ নিজেরাই নির্ধারণ করি এবং আমাদের নিজেদের আবহাওয়া নিজেরাই তৈরি করি।

