পোল্যান্ডে আশ্রয় নেওয়া ইউক্রেনীয় নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় গড়ে ওঠা একটি আশ্রয়কেন্দ্র এখন চরম অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক তহবিল সংকট, অন্যদিকে দেশটিতে ইউক্রেনীয়দের প্রতি ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈরিতার কারণে 'মার্টিনকা' (Martynka) নামের এই সহায়তা সংস্থাটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরুর ঠিক আগে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২৯ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় অভিবাসী নাস্ত্য পোদোরোজনিয়া (Nastya Podorozhnya) নিজের বোন ও ভাগ্নিদের পোল্যান্ডে নিয়ে আসতে ইউক্রেনে ছুটে যান। সেই সময় পোলিশ স্বেচ্ছাসেবকদের আন্তরিকতা দেখলেও তিনি একটি বড় ঝুঁকিও টের পান। অপরিচিতদের কাছ থেকে সাহায্য নিতে গিয়ে ইউক্রেনীয় নারীরা মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে তিনি 'মার্টিনকা' নামের একটি হেল্পলাইন ও সহায়তা সংস্থা গড়ে তোলেন। এটি মূলত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার ইউক্রেনীয় নারী শরণার্থীদের জন্য কাজ করে।
তবে চার বছর পর এসে এই আশ্রয়কেন্দ্রটি চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্রাকো শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি সাধারণ দুই কক্ষের ফ্ল্যাটে অবস্থিত এই আশ্রয়কেন্দ্রটি এ পর্যন্ত ১০০ জনেরও বেশি ইউক্রেনীয় নারী ও শিশুকে আশ্রয় দিয়েছে। এখানে নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, চাকরি ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। পোদোরোজনিয়া নিজেই ২০১৬ সালে পোল্যান্ডের রাস্তায় ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছিলেন। তিনি জানান, বর্তমানে অনুদানের জন্য আবেদন করলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র গালাগাল ও বিদ্বেষের শিকার হতে হচ্ছে। পোদোরোজনিয়ার মতে, ইউক্রেনীয় হওয়ার কারণেই তাকে এই আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুতে প্রায় ৩৫ লাখ ইউক্রেনীয় পোল্যান্ডে প্রবেশ করেছিল। ২০২২ সালের শেষের দিকে এই সংখ্যা প্রায় ১০ লাখে নেমে আসে। যারা থেকে গেছেন, তাদের ৭০ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন। ডেলয়েটের (Deloitte) এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পোল্যান্ডের মোট দেশজ উৎপাদনে (GDP) ইউক্রেনীয়রা ২.৭ শতাংশ অবদান রেখেছেন। যুদ্ধের আগে থেকেই আরও প্রায় ১০ লাখ ইউক্রেনীয় অর্থনৈতিক অভিবাসী হিসেবে পোল্যান্ডে বাস করছিলেন।
তবে সম্প্রতি পোল্যান্ডে ইউক্রেনীয়দের প্রতি বিদ্বেষ বেড়েছে। ওয়ারশ-র ভিস্টুলা ইউনিভার্সিটির গবেষক ওলেনা বাবাকোভা জানান, ২০২৫ সালের পোলিশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সব রাজনৈতিক দলই ইউক্রেন-বিরোধী বক্তব্যকে হাতিয়ার করেছে। নির্বাচনে জয়ী জাতীয়তাবাদী-রক্ষণশীল শিবিরের ক্যারল নাভরোকি (Karol Nawrocki) সরকারি সুযোগ-সুবিধায় ইউক্রেনীয়দের চেয়ে পোলিশ নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, উদারপন্থী প্রার্থী রাফাল জাসকোভস্কি (Rafał Trzaskowski) ইউক্রেনীয়দের শিশু কল্যাণ ভাতা সীমিত করার প্রস্তাব করেন।
এই রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে দুই দেশের ঐতিহাসিক বিরোধও নতুন করে সামনে এসেছে। গত জুনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোলিশদের ওপর গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত একটি ইউক্রেনীয় আধা-সামরিক বাহিনীর নামে একটি সামরিক ইউনিটের নামকরণ করলে পোল্যান্ডে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর জবাবে নাভরোকি জেলেনস্কিকে দেওয়া একটি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রত্যাহার করে নেন। পোলিশ পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৮০ জন ইউক্রেনীয় নাগরিক বিদ্বেষমূলক অপরাধের শিকার হয়েছেন, যা ২০২৫ সালে ছিল ২৭৫ জন এবং ২০২৪ সালে ছিল ২৬৭ জন। পোল্যান্ডের রাস্তায় ইউক্রেনীয়দের ওপর হামলার ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক জুলাইয়ের শেষের দিকে সহিংসতা ও ঘৃণার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কথা বলেন।
এদিকে পোলিশ সরকার ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দিচ্ছে। সরকারের দাবি, অনেকেই ইতিমধ্যে নিজেদের পরিস্থিতি গুছিয়ে নিয়েছেন। তবে পোল্যান্ডের ওমবুডসম্যান সতর্ক করেছেন যে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বহু সন্তান নিয়ে একা থাকা মা, প্রবীণ ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চরম বিপাকে পড়বেন। ইউক্রেনে ২৩ থেকে ৬০ বছর বয়সী সামরিক যোগ্যতাসম্পন্ন পুরুষদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকায় শরণার্থীদের মধ্যে একক মায়েদের সংখ্যাই বেশি। 'ইউক্রেনিয়ান হাউস'-এর ইউলিয়া রেপেনকো বলেন, তাদের সংস্থা এখন সবচেয়ে অসহায় মানুষদের সহায়তা দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
পোল্যান্ডের পরিবার, শ্রম ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক উপমন্ত্রী কাতারজিনা নোভাকোভস্কা জানান, সবচেয়ে অসহায় ব্যক্তিরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাচ্ছেন এবং অন্যদের সমাজকর্মীদের সাহায্য নেওয়া উচিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক সাহায্যও ক্রমান্বয়ে কমছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্যমতে, ২০২২ সালের তুলনায় বর্তমানে ইউক্রেনীয়দের জন্য আন্তর্জাতিক দাতাদের তহবিল অর্ধেক কমে গেছে। মার্টিনকার হেল্পলাইন কর্মী সোনিয়া নোভিতস্কা বলেন, দাতারা চলে গেলেও যুদ্ধ এখনও চলছে এবং এটি আরও মারাত্মক রূপ নিয়েছে। পোদোরোজনিয়া বলেন, পোলিশদের বোঝা উচিত যে আমরা এমন মানুষদের সাহায্য করছি যারা সাহায্য না পেলে গৃহহীন হয়ে পড়ত। মূলত মার্টিনকা পোলিশ সরকারের দায়িত্বটিই পালন করছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ২৯ বছর বয়সী পোদোরোজনিয়া ইতিমধ্যেই পোল্যান্ডে বসবাস করছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে, তিনি তাঁর বোন ও ভাগ্নিদের সেখান থেকে বের করে আনতে সাহায্য করার জন্য দ্রুত ইউক্রেনে ফিরে যান।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহে প্রায় ৩৫ লাখ ইউক্রেনীয় পোল্যান্ডে পালিয়ে যান। পোলিশ নাগরিকরা রেলস্টেশনগুলোতে তাঁদের স্বাগত জানান এবং তাঁদের জন্য নিজেদের ঘরের দরজা খুলে দেন, আর সরকার শরণার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়।

