নেপাল ও চীনের স্বায়ত্তশাসিত তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৫৪০ ছাড়িয়ে গেছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৯৩ হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে রেড ক্রস। বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সহায়তা নেটওয়ার্ক ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) জানিয়েছে, এই দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট মানসিক ও শারীরিক ট্রমা বা আঘাতের মাত্রা অত্যন্ত তীব্র ও বিশাল।
আইএফআরসি-র নেপাল প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেভিড ফিশার শুক্রবার জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে কাঠমান্ডু থেকে যুক্ত হয়ে বলেন, "এই ঘটনার ট্রমা অত্যন্ত তীব্র। হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা ধারণা করছি, অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তাদের জরুরি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।" তিনি আরও জানান, রাস্তাঘাট ও সেতু ধসে পড়া এবং বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকায় উদ্ধারকারীরা এখনও পৌঁছাতে পারেননি। ইতিমধ্যে নেপাল রেড ক্রস দুর্গতদের মধ্যে খাদ্য, পানি, হাইজিন কিট, ম্যাট্রেস ও কম্বলসহ জরুরি ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে।
সুনামির মতো তীব্র পানির তোড়ে ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া, সেতু ভেঙে ফেলা এবং যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া এই দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। জাতিসংঘের ত্রাণ বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, মানুষের জীবন বাঁচাতে জাতিসংঘ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কাজ করছে। নেপালে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী লিলা পিটার্স ইয়াহিয়াহ জানিয়েছেন, দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টারে করে খাবার পানি পাঠানো হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ৪০টিরও বেশি সেতু ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৪০ কিলোমিটারেরও বেশি সড়ক সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে নেপাল সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হলো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালানো।
জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যালয়ের (ইউএনডিআরআর) প্রধান কামাল কিশোর এই বিপর্যয়কে অত্যন্ত বিরল উল্লেখ করে বলেন, "পার্বত্য অঞ্চলে এত বড় বিপর্যয় আমরা অনেক দীর্ঘ সময় ধরে দেখিনি। এটি সত্যিই বিশাল এবং আমরা এখনও ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ পরিমাণ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি।" তিনি সতর্ক করে বলেন, এই দুর্যোগটি এমন একটি ইকোসিস্টেমে ঘটছে যেখানে একটি বিপর্যয় থেকে একের পর এক আরও বহু ধরনের বিপদের সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ নিশ্চিত করেছে যে এই দুর্যোগে অন্তত ১৪টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ইউনিসেফের মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস সাংবাদিকদের বলেন, "দুর্ভাগ্যবশত আমরা এই ট্র্যাজেডির কেবল শুরুটা দেখছি। যারা বেঁচে গেছে, তাদের জন্য জরুরি অবস্থা এখনও শেষ হয়নি। শিশুরা এখন রোগব্যাধি, অপুষ্টি, সহিংসতা ও শোষণের ঝুঁকির পাশাপাশি মারাত্মক মানসিক ট্রমার মুখোমুখি হচ্ছে।" তিনি জানান, দুর্যোগে ১৮টি স্কুল সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং ২০টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১০,০০০ শিশুর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, দুর্যোগের পর থেকে ৮ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন এবং ৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডব্লিউএইচও-র মুখপাত্র তারিক জাসারেভিচ জানান, স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। সংস্থাটি ইতিমধ্যে নেপালে সার্জিক্যাল মাস্ক, গ্লাভস এবং মরদেহ বহনের জন্য বডি ব্যাগ সরবরাহ করেছে।

